সম্মেলনের ঘোষণা
Do you know what is hidden treasure . It seems like very good short name . But one thing you have to know that every man is a genius in the world . But properly not utilization ruined their brain and extra ordinary power . Hidden treasure is very essential part of every mans life .Cause you may be genius as like as Eisenstein . He was not too much genius .So one word , Utilize
Friday, August 22, 2014
দুর্নীতির উত্স ও ইতিবৃত্ত | dailybartoman.com
শেখ
আতাউর রহমান : যে নীতি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিপদগ্রস্ত করে তাকে সহজ
কথায় দুর্নীতি বলা যায়। এর বিপরীতে সুনীতি মানুষের শুভ ও কল্যাণের পথকে
করে প্রশস্ত। মোটকথা, অপরের স্বার্থ ও অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল নিজের
স্বার্থ ও অধিকার হাসিলের লক্ষ্যে কাজ করাকেই বলে দুর্নীতি। দুর্নীতির
ইতিহাস অনেক পুরনো। সভ্যতার সূচনালগ্নের পূর্ব থেকে আদিম মানুষের যুগ থেকে
দুর্নীতির উদ্ভব। আদিম যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এক অঞ্চলে যখন মানুষের
খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চলে
ক্ষমতাবান গোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হতো। পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করে এক গোত্র
অন্য গোত্রের পাথরের অস্ত্রের মোকাবিলা করত। সঙ্গত কারণেই দুর্বল গোত্র
ক্ষমতাবান গোত্রের কাছে পরাজিত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিত। মূলত মানুষের অভাব
বা প্রয়োজন আদিম মানুষকে এরকম অশুভ ও অকল্যাণময় কাজে তাড়িত করে। এসব আমরা
নৃতত্ত্ব ও সভ্যতার ইতিহাস থেকে জেনেছি। বস্তুত প্রয়োজন আইন মানে না, অভাবে
স্বভাব নষ্ট (ঘবপবংংরঃু শহড়ংি হড় ষধ)ি — এসব কিছুই কি আদিম মানুষ থেকে
সভ্য মানুষকেও তাড়িত করছে দুর্নীতির দিকে? এই প্রশ্নের জবাবে মনীষীরা
বলেছেন নানা কথা। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানী আল বেরুনী (৯৭৩-১০৪৮
খ্রি.) বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের গুণাবলীকে দোষে পরিণত করে।’ আবার কোনো
কোনো মনীষী বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের সব গুণ নষ্ট করে দেয়।’ অতএব কোনো
গরিব মানুষ কখনো শুভ চিন্তা করতে পারে না, সে কেবল নিজের আখের গোছাতে
ব্যস্ত থাকে। অন্যের শুভ কামনা করা বা কল্যাণ করার মতো ফুরসত তার নেই। তবে
গরিবের মধ্যেও শুভ চিন্তক আছেন আর ধনীর মধ্যে সে অশুভ চিন্তক নেই, তা বলা
যাবে না এবং কোনো কোনো ধনী লোক মানুষের অকল্যাণ করে থাকেন। ইতিহাস পাঠে
জানা যায়— ইংল্যান্ড উন্নত হয়েছে গরিব মানুষের শ্রমে। ইংল্যান্ডের গরিব
মানুষ শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কাজ করেছেন, দেশ গড়েছেন। অভাবে স্বভাব নষ্ট
বা অভাবের তাড়নায় মানুষ হয় দুর্নীতিবাজ। এ কথার কিছুটা সত্যতা আমরা সমাজের
গরিব লোক, গরিব পরিবার এবং তৃতীয় বিশ্বের গরিব রাষ্ট্রের মানুষের দৈনন্দিন
অহিতকর কার্যকলাপ থেকে উপলব্ধি করি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাধরেরাই
করেছে দুর্নীতি। আজকের উন্নত দেশ ইংল্যান্ডের রাজা ও ভূস্বামীরা ষোলো শতক
বা তার পূর্বে যে গণঅত্যাচার তথা দুর্নীতি করেছেন তা আমাদের দেশের
শাসক-আমলার দুর্নীতি থেকে আরও ভয়াবহ। কার্ল মার্কস তার ‘ডাস ক্যাপিটাল’
গ্রন্থে সেই গণঅত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরেছেন এভাবে: ‘ষষ্ঠ এডওয়ার্ডের
রাজত্বের প্রথম বছর ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে একটি বিধানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে,
কেউ কাজ করতে আপত্তি করলে যে লোক সেই সংবাদটা জানাবে, তার কাছে গোলাম
হিসেবে থাকার দণ্ড পাবে। ... চাবুক আর শেকল দিয়ে তাকে যে কোনো কাজ করতে
বাধ্য করার অধিকার থাকবে মনিবের, তা সে কাজটা যত জঘন্যই হোক। গোলাম যদি এক
পক্ষকাল অনুপস্থিত থাকে, তাহলে যাবজ্জীবন গোলামিতে দণ্ডিত হবে এবং তার
কপালে বা পিঠে ঝ (ঝষধাব) জ্বলন্ত লৌহ শলাকা দ্বারা দেগে দেয়া হবে। তিনবার
সে যদি পালায়, তাহলে দুর্বৃত্ত হিসেবে তার প্রাণদণ্ড হবে...। কোনো ভবঘুরেকে
যদি বিনা কাজে তিনদিন ধরে ঘুরতে দেখা যায়, তাহলে তার জন্মস্থানে নিয়ে গিয়ে
গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে ঠ অক্ষর দেগে দেয়া হবে...।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
শেখ
আতাউর রহমান : যে নীতি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিপদগ্রস্ত করে তাকে সহজ
কথায় দুর্নীতি বলা যায়। এর বিপরীতে সুনীতি মানুষের শুভ ও কল্যাণের পথকে
করে প্রশস্ত। মোটকথা, অপরের স্বার্থ ও অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল নিজের
স্বার্থ ও অধিকার হাসিলের লক্ষ্যে কাজ করাকেই বলে দুর্নীতি। দুর্নীতির
ইতিহাস অনেক পুরনো। সভ্যতার সূচনালগ্নের পূর্ব থেকে আদিম মানুষের যুগ থেকে
দুর্নীতির উদ্ভব। আদিম যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এক অঞ্চলে যখন মানুষের
খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চলে
ক্ষমতাবান গোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হতো। পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করে এক গোত্র
অন্য গোত্রের পাথরের অস্ত্রের মোকাবিলা করত। সঙ্গত কারণেই দুর্বল গোত্র
ক্ষমতাবান গোত্রের কাছে পরাজিত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিত। মূলত মানুষের অভাব
বা প্রয়োজন আদিম মানুষকে এরকম অশুভ ও অকল্যাণময় কাজে তাড়িত করে। এসব আমরা
নৃতত্ত্ব ও সভ্যতার ইতিহাস থেকে জেনেছি। বস্তুত প্রয়োজন আইন মানে না, অভাবে
স্বভাব নষ্ট (ঘবপবংংরঃু শহড়ংি হড় ষধ)ি — এসব কিছুই কি আদিম মানুষ থেকে
সভ্য মানুষকেও তাড়িত করছে দুর্নীতির দিকে? এই প্রশ্নের জবাবে মনীষীরা
বলেছেন নানা কথা। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানী আল বেরুনী (৯৭৩-১০৪৮
খ্রি.) বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের গুণাবলীকে দোষে পরিণত করে।’ আবার কোনো
কোনো মনীষী বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের সব গুণ নষ্ট করে দেয়।’ অতএব কোনো
গরিব মানুষ কখনো শুভ চিন্তা করতে পারে না, সে কেবল নিজের আখের গোছাতে
ব্যস্ত থাকে। অন্যের শুভ কামনা করা বা কল্যাণ করার মতো ফুরসত তার নেই। তবে
গরিবের মধ্যেও শুভ চিন্তক আছেন আর ধনীর মধ্যে সে অশুভ চিন্তক নেই, তা বলা
যাবে না এবং কোনো কোনো ধনী লোক মানুষের অকল্যাণ করে থাকেন। ইতিহাস পাঠে
জানা যায়— ইংল্যান্ড উন্নত হয়েছে গরিব মানুষের শ্রমে। ইংল্যান্ডের গরিব
মানুষ শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কাজ করেছেন, দেশ গড়েছেন। অভাবে স্বভাব নষ্ট
বা অভাবের তাড়নায় মানুষ হয় দুর্নীতিবাজ। এ কথার কিছুটা সত্যতা আমরা সমাজের
গরিব লোক, গরিব পরিবার এবং তৃতীয় বিশ্বের গরিব রাষ্ট্রের মানুষের দৈনন্দিন
অহিতকর কার্যকলাপ থেকে উপলব্ধি করি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাধরেরাই
করেছে দুর্নীতি। আজকের উন্নত দেশ ইংল্যান্ডের রাজা ও ভূস্বামীরা ষোলো শতক
বা তার পূর্বে যে গণঅত্যাচার তথা দুর্নীতি করেছেন তা আমাদের দেশের
শাসক-আমলার দুর্নীতি থেকে আরও ভয়াবহ। কার্ল মার্কস তার ‘ডাস ক্যাপিটাল’
গ্রন্থে সেই গণঅত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরেছেন এভাবে: ‘ষষ্ঠ এডওয়ার্ডের
রাজত্বের প্রথম বছর ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে একটি বিধানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে,
কেউ কাজ করতে আপত্তি করলে যে লোক সেই সংবাদটা জানাবে, তার কাছে গোলাম
হিসেবে থাকার দণ্ড পাবে। ... চাবুক আর শেকল দিয়ে তাকে যে কোনো কাজ করতে
বাধ্য করার অধিকার থাকবে মনিবের, তা সে কাজটা যত জঘন্যই হোক। গোলাম যদি এক
পক্ষকাল অনুপস্থিত থাকে, তাহলে যাবজ্জীবন গোলামিতে দণ্ডিত হবে এবং তার
কপালে বা পিঠে ঝ (ঝষধাব) জ্বলন্ত লৌহ শলাকা দ্বারা দেগে দেয়া হবে। তিনবার
সে যদি পালায়, তাহলে দুর্বৃত্ত হিসেবে তার প্রাণদণ্ড হবে...। কোনো ভবঘুরেকে
যদি বিনা কাজে তিনদিন ধরে ঘুরতে দেখা যায়, তাহলে তার জন্মস্থানে নিয়ে গিয়ে
গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে ঠ অক্ষর দেগে দেয়া হবে...।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
corruption 5
সুনীতি নির্বাসনে; দুর্নীতি সিংহাসনে
|
প্র ফে স র ড. সু কো ম ল ব ড়ু য়া
|
একুশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উন্নতির এমন এক শীর্ষস্থানে এসেও
বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে
দাঁড়াতে পারছে না। অফুরন্ত সম্পদ আর বিপুল জনশক্তি থাকার পরও জাতীয় উন্নয়ন ও
অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তার মধ্যে
দুর্নীতি হলো অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি দুর্নীতি কীভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। এ দুর্নীতির কারণে দেশে বিরাজ করছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক এক চরম অস্থিতিশীলতা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, অর্থনৈতিক চরম দুরবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক জীবনে নানা ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অহরহ। তাই আজ আমাদের এই প্রিয় দেশটির এত করুণ দশা। এত চেষ্টার পরও আজ আমরা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। পারছি না কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতেও। চারদিকে যেন চলছে চরম এক অরাজকতা।
কেন জানি এই একটি সুন্দর দেশের প্রতি আমাদের এত অবহেলা? কী নেই আমাদের দেশে? প্রাকৃতিক আর নৈসর্গিক সম্পদভরা এদেশে নদী, সাগর, খাল-বিল, পর্বত, বিশাল সবুজ মাঠ তো আছেই; আছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল জনসম্পদও। তারপরও কেন আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নতির দিকে এগুতে পারছি না? মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না? নিজকে প্রশ্ন করি বার বার। এর উত্তর মেলে শুধু, নীতি-নৈতিকতার অভাব; আর যেন আত্মশক্তি অপব্যবহারের ব্যর্থতা। একে আরও সহজভাষায় বললে বলা যায়, এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের সমাজের নানা স্তরে অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, উেকাচ তো আছেই; এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের দেশপ্রেমের অভাববোধটুকুও। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক সঙ্কট আর অস্থিতিশীলতার বিরাট বাধাও।
দুর্নীতি বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে যেখানে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সামগ্রিক জনজীবনে। আমরা জানি, যে কোনো দেশ, সমাজ, বিশ্ব; এমনকি পরিবারও যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সেখানে কেউ আর সুস্থ ও সবলভাবে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অবস্থাও আজ তাই। সেজন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতিবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘দুর্নীতি এক মারাত্মক ব্যাধি যার আক্রমণে গোটা সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়।’
‘দুর্নীতি’ বলতে আমরা আক্ষরিক অর্থে সমাজে প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধাচরণকেই বুঝি। সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, উেকাচ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত্, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়, সম্পদের অপচয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন কিংবা নানা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপহার গ্রহণ করা প্রভৃতিই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির সঠিক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন, যেখানে ব্যক্তি তার নানা অপরাধ সংঘটিত করে অতি সংগোপনে নানাভাবে, নানা অজুহাতে, পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে। তাই বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ বলেন, ‘ওহ পড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ ধ ঢ়বত্ংড়হ রিষষভঁষষু হবমষবপঃবফ যরং ংঢ়বপরভরবফ ফঁঃু রহ ড়ত্ফবত্ ঃড় যধাব ধ ঁহফবত্ ধফাধহঃধমব.’ অর্থাত্ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার। এই অর্থে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করাকেই দুর্নীতি বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে আরও নানা সংজ্ঞা আছে। তবে সব মতের যে সিদ্ধান্ত সেটি হলো ‘ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ সবধহং ধহুঃযরহম ফড়রহম রহ ঁহঁংঁধষ ধুি.’
আমরা জানি দুর্নীতি কোনো জীবজন্তু কিংবা পশুপাখি করে না; দুর্নীতি করে মানুষ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ জীবটি। তাই শাস্ত্র বলছে, ‘যে জীবন অর্থলোলুপ, তীব্র অর্থলালসায় বিভোর সেই জীবনই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয় অধিক। তিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-জ্ঞানী, সরকারি-বেসরকারি, বিত্তশালী, ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন। আমরা বুঝি, যে জীবন অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে ধাবিত সেই জীবন দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয় বেশি। সে জীবন মানবতাকে করে ভূলুণ্ঠিত, কলুষিত। আর জাতীয় জীবনে ডেকে আনে চরম সর্বনাশা পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে প্লেটোর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে নিরর্থক।’ আমাদের দেশের আজ তাই হয়েছে।
আজ আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারলেও এর থেকে উত্তরণের পথগুলো খুঁজতে পারছি না আমরা। নেই কোনো বিচারের ব্যবস্থা, নেই কোনো শাস্তির ভয়-ভীতি এবং দণ্ডও। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশের উঁচুস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে, যেখানে সহজে হাত দেয়া যায় না। দেশের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমাসহ সমাজ ও দেশের নানা সেক্টরের ক্ষমতাধররা যেখানে সংঘবদ্ধভাবে এই কাজগুলো করছে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কী করবে? বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির জন্য আইনশৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। নানা অপরাধচক্র কিংবা রাষ্ট্রের শক্তিধর ব্যক্তিরা দুর্নীতির নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে। আজকে দেশের অবস্থা মারাত্মক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। সুনীতি যেন আজ নির্বাসনে চলে গেছে, দুর্নীতি যেন আজ রাজার ঘরে সিংহাসনে বসে আছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।
আমরা যদি সবাই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হই, ধর্মের অনুশাসন ও নীতি-নৈতিকতাগুলো মেনে চলি, আজ আমাদের জন্য এত দুরবস্থা হয় না। আমরা কেউ সিচন্তা করি না। সত্কর্ম করি না। কাজের ভালো-মন্দ বিচার করি না। এই জন্যই তো বৌদ্ধ নীতি-দর্শনে আটটি সুন্দর নীতির কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় বৌদ্ধ পারিভাষিক অর্থে আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি পদ অনুসরণ করে চললে সেই মানবজীবন হবে ধন্য, গৌরবান্বিত। সেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ তথা দেশ হবে অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। এজন্যই সব ধর্মে সুনীতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আদর্শ ও সচ্চরিত্র গঠনের কথা।
সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ-কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ লোপাট, ডেসটিনির অবৈধ টাকা আত্মসাত্ ও পাচার, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে কিনা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে এসব দুর্নীতি সব খবরকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় এ খবর কে না জানে? আমরা যেমন অবাক হয়েছি, আমাদের মতো বিশ্বও অবাক হয়েছে। তারা ভাবছে, ছোট্ট একটা দেশে এ কী হচ্ছে?
বৌদ্ধ মতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ মঙ্গল হলো ব্যক্তির চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিচিত্ত উদার ও নির্মলীকরণ এবং মন্দ বা অকুশলবর্জিত জীবনধারণ করা। এটিই সুস্থ ও সফল জীবনধারণ করার মূল উপাদান। এই জীবনপদ্ধতি প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত সবাই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলে, অনুশীলন করলে সমাজের নানা স্তরে, রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে এবং গোটা বিশ্বের মানব জীবনে অবশ্যই সন্ত্রাস নির্মূল হবে, সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে।
অতএব আমাদের দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই ব্যক্তিকে সত্ হতে হবে। নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নিজেকে শাসন করতে হবে। বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দেশপ্রেম ও দেশের মর্যাদার জন্য নিরঙ্কুশ চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি সব অপরাধকে একটি বন্ধনীর মধ্যে আনতে হবে যেন মানবিক গুণগুলোকে জাগাতে পারি এবং পাশাপাশি আমাদের মানবিক গুণগুলোকে ব্যবহার করতে হবে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে, সর্বজায়গায়। এজন্যই আমাদের সবাইকে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এক কাতারে, সংঘবদ্ধভাবে।
প্রার্থনা করি আমাদের দেশের সব ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন, অপরাধ ও অনৈতিকতা দূরীভূত হোক। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসুক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি দুর্নীতি কীভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। এ দুর্নীতির কারণে দেশে বিরাজ করছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক এক চরম অস্থিতিশীলতা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, অর্থনৈতিক চরম দুরবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক জীবনে নানা ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অহরহ। তাই আজ আমাদের এই প্রিয় দেশটির এত করুণ দশা। এত চেষ্টার পরও আজ আমরা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। পারছি না কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতেও। চারদিকে যেন চলছে চরম এক অরাজকতা।
কেন জানি এই একটি সুন্দর দেশের প্রতি আমাদের এত অবহেলা? কী নেই আমাদের দেশে? প্রাকৃতিক আর নৈসর্গিক সম্পদভরা এদেশে নদী, সাগর, খাল-বিল, পর্বত, বিশাল সবুজ মাঠ তো আছেই; আছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল জনসম্পদও। তারপরও কেন আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নতির দিকে এগুতে পারছি না? মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না? নিজকে প্রশ্ন করি বার বার। এর উত্তর মেলে শুধু, নীতি-নৈতিকতার অভাব; আর যেন আত্মশক্তি অপব্যবহারের ব্যর্থতা। একে আরও সহজভাষায় বললে বলা যায়, এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের সমাজের নানা স্তরে অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, উেকাচ তো আছেই; এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের দেশপ্রেমের অভাববোধটুকুও। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক সঙ্কট আর অস্থিতিশীলতার বিরাট বাধাও।
দুর্নীতি বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে যেখানে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সামগ্রিক জনজীবনে। আমরা জানি, যে কোনো দেশ, সমাজ, বিশ্ব; এমনকি পরিবারও যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সেখানে কেউ আর সুস্থ ও সবলভাবে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অবস্থাও আজ তাই। সেজন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতিবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘দুর্নীতি এক মারাত্মক ব্যাধি যার আক্রমণে গোটা সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়।’
‘দুর্নীতি’ বলতে আমরা আক্ষরিক অর্থে সমাজে প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধাচরণকেই বুঝি। সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, উেকাচ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত্, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়, সম্পদের অপচয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন কিংবা নানা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপহার গ্রহণ করা প্রভৃতিই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির সঠিক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন, যেখানে ব্যক্তি তার নানা অপরাধ সংঘটিত করে অতি সংগোপনে নানাভাবে, নানা অজুহাতে, পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে। তাই বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ বলেন, ‘ওহ পড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ ধ ঢ়বত্ংড়হ রিষষভঁষষু হবমষবপঃবফ যরং ংঢ়বপরভরবফ ফঁঃু রহ ড়ত্ফবত্ ঃড় যধাব ধ ঁহফবত্ ধফাধহঃধমব.’ অর্থাত্ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার। এই অর্থে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করাকেই দুর্নীতি বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে আরও নানা সংজ্ঞা আছে। তবে সব মতের যে সিদ্ধান্ত সেটি হলো ‘ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ সবধহং ধহুঃযরহম ফড়রহম রহ ঁহঁংঁধষ ধুি.’
আমরা জানি দুর্নীতি কোনো জীবজন্তু কিংবা পশুপাখি করে না; দুর্নীতি করে মানুষ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ জীবটি। তাই শাস্ত্র বলছে, ‘যে জীবন অর্থলোলুপ, তীব্র অর্থলালসায় বিভোর সেই জীবনই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয় অধিক। তিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-জ্ঞানী, সরকারি-বেসরকারি, বিত্তশালী, ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন। আমরা বুঝি, যে জীবন অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে ধাবিত সেই জীবন দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয় বেশি। সে জীবন মানবতাকে করে ভূলুণ্ঠিত, কলুষিত। আর জাতীয় জীবনে ডেকে আনে চরম সর্বনাশা পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে প্লেটোর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে নিরর্থক।’ আমাদের দেশের আজ তাই হয়েছে।
আজ আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারলেও এর থেকে উত্তরণের পথগুলো খুঁজতে পারছি না আমরা। নেই কোনো বিচারের ব্যবস্থা, নেই কোনো শাস্তির ভয়-ভীতি এবং দণ্ডও। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশের উঁচুস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে, যেখানে সহজে হাত দেয়া যায় না। দেশের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমাসহ সমাজ ও দেশের নানা সেক্টরের ক্ষমতাধররা যেখানে সংঘবদ্ধভাবে এই কাজগুলো করছে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কী করবে? বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির জন্য আইনশৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। নানা অপরাধচক্র কিংবা রাষ্ট্রের শক্তিধর ব্যক্তিরা দুর্নীতির নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে। আজকে দেশের অবস্থা মারাত্মক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। সুনীতি যেন আজ নির্বাসনে চলে গেছে, দুর্নীতি যেন আজ রাজার ঘরে সিংহাসনে বসে আছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।
আমরা যদি সবাই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হই, ধর্মের অনুশাসন ও নীতি-নৈতিকতাগুলো মেনে চলি, আজ আমাদের জন্য এত দুরবস্থা হয় না। আমরা কেউ সিচন্তা করি না। সত্কর্ম করি না। কাজের ভালো-মন্দ বিচার করি না। এই জন্যই তো বৌদ্ধ নীতি-দর্শনে আটটি সুন্দর নীতির কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় বৌদ্ধ পারিভাষিক অর্থে আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি পদ অনুসরণ করে চললে সেই মানবজীবন হবে ধন্য, গৌরবান্বিত। সেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ তথা দেশ হবে অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। এজন্যই সব ধর্মে সুনীতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আদর্শ ও সচ্চরিত্র গঠনের কথা।
সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ-কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ লোপাট, ডেসটিনির অবৈধ টাকা আত্মসাত্ ও পাচার, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে কিনা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে এসব দুর্নীতি সব খবরকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় এ খবর কে না জানে? আমরা যেমন অবাক হয়েছি, আমাদের মতো বিশ্বও অবাক হয়েছে। তারা ভাবছে, ছোট্ট একটা দেশে এ কী হচ্ছে?
বৌদ্ধ মতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ মঙ্গল হলো ব্যক্তির চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিচিত্ত উদার ও নির্মলীকরণ এবং মন্দ বা অকুশলবর্জিত জীবনধারণ করা। এটিই সুস্থ ও সফল জীবনধারণ করার মূল উপাদান। এই জীবনপদ্ধতি প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত সবাই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলে, অনুশীলন করলে সমাজের নানা স্তরে, রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে এবং গোটা বিশ্বের মানব জীবনে অবশ্যই সন্ত্রাস নির্মূল হবে, সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে।
অতএব আমাদের দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই ব্যক্তিকে সত্ হতে হবে। নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নিজেকে শাসন করতে হবে। বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দেশপ্রেম ও দেশের মর্যাদার জন্য নিরঙ্কুশ চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি সব অপরাধকে একটি বন্ধনীর মধ্যে আনতে হবে যেন মানবিক গুণগুলোকে জাগাতে পারি এবং পাশাপাশি আমাদের মানবিক গুণগুলোকে ব্যবহার করতে হবে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে, সর্বজায়গায়। এজন্যই আমাদের সবাইকে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এক কাতারে, সংঘবদ্ধভাবে।
প্রার্থনা করি আমাদের দেশের সব ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন, অপরাধ ও অনৈতিকতা দূরীভূত হোক। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসুক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
corruption 4
সুনীতি নির্বাসনে; দুর্নীতি সিংহাসনে
প্র ফে স র ড. সু কো ম ল ব ড়ু য়া
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
একুশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উন্নতির এমন এক শীর্ষস্থানে এসেও
বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে
দাঁড়াতে পারছে না। অফুরন্ত সম্পদ আর বিপুল জনশক্তি থাকার পরও জাতীয় উন্নয়ন ও
অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তার মধ্যে
দুর্নীতি হলো অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি দুর্নীতি কীভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। এ দুর্নীতির কারণে দেশে বিরাজ করছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক এক চরম অস্থিতিশীলতা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, অর্থনৈতিক চরম দুরবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক জীবনে নানা ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অহরহ। তাই আজ আমাদের এই প্রিয় দেশটির এত করুণ দশা। এত চেষ্টার পরও আজ আমরা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। পারছি না কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতেও। চারদিকে যেন চলছে চরম এক অরাজকতা।
কেন জানি এই একটি সুন্দর দেশের প্রতি আমাদের এত অবহেলা? কী নেই আমাদের দেশে? প্রাকৃতিক আর নৈসর্গিক সম্পদভরা এদেশে নদী, সাগর, খাল-বিল, পর্বত, বিশাল সবুজ মাঠ তো আছেই; আছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল জনসম্পদও। তারপরও কেন আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নতির দিকে এগুতে পারছি না? মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না? নিজকে প্রশ্ন করি বার বার। এর উত্তর মেলে শুধু, নীতি-নৈতিকতার অভাব; আর যেন আত্মশক্তি অপব্যবহারের ব্যর্থতা। একে আরও সহজভাষায় বললে বলা যায়, এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের সমাজের নানা স্তরে অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, উেকাচ তো আছেই; এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের দেশপ্রেমের অভাববোধটুকুও। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক সঙ্কট আর অস্থিতিশীলতার বিরাট বাধাও।
দুর্নীতি বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে যেখানে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সামগ্রিক জনজীবনে। আমরা জানি, যে কোনো দেশ, সমাজ, বিশ্ব; এমনকি পরিবারও যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সেখানে কেউ আর সুস্থ ও সবলভাবে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অবস্থাও আজ তাই। সেজন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতিবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘দুর্নীতি এক মারাত্মক ব্যাধি যার আক্রমণে গোটা সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়।’
‘দুর্নীতি’ বলতে আমরা আক্ষরিক অর্থে সমাজে প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধাচরণকেই বুঝি। সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, উেকাচ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত্, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়, সম্পদের অপচয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন কিংবা নানা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপহার গ্রহণ করা প্রভৃতিই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির সঠিক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন, যেখানে ব্যক্তি তার নানা অপরাধ সংঘটিত করে অতি সংগোপনে নানাভাবে, নানা অজুহাতে, পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে। তাই বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ বলেন, ‘ওহ পড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ ধ ঢ়বত্ংড়হ রিষষভঁষষু হবমষবপঃবফ যরং ংঢ়বপরভরবফ ফঁঃু রহ ড়ত্ফবত্ ঃড় যধাব ধ ঁহফবত্ ধফাধহঃধমব.’ অর্থাত্ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার। এই অর্থে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করাকেই দুর্নীতি বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে আরও নানা সংজ্ঞা আছে। তবে সব মতের যে সিদ্ধান্ত সেটি হলো ‘ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ সবধহং ধহুঃযরহম ফড়রহম রহ ঁহঁংঁধষ ধুি.’
আমরা জানি দুর্নীতি কোনো জীবজন্তু কিংবা পশুপাখি করে না; দুর্নীতি করে মানুষ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ জীবটি। তাই শাস্ত্র বলছে, ‘যে জীবন অর্থলোলুপ, তীব্র অর্থলালসায় বিভোর সেই জীবনই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয় অধিক। তিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-জ্ঞানী, সরকারি-বেসরকারি, বিত্তশালী, ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন। আমরা বুঝি, যে জীবন অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে ধাবিত সেই জীবন দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয় বেশি। সে জীবন মানবতাকে করে ভূলুণ্ঠিত, কলুষিত। আর জাতীয় জীবনে ডেকে আনে চরম সর্বনাশা পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে প্লেটোর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে নিরর্থক।’ আমাদের দেশের আজ তাই হয়েছে।
আজ আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারলেও এর থেকে উত্তরণের পথগুলো খুঁজতে পারছি না আমরা। নেই কোনো বিচারের ব্যবস্থা, নেই কোনো শাস্তির ভয়-ভীতি এবং দণ্ডও। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশের উঁচুস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে, যেখানে সহজে হাত দেয়া যায় না। দেশের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমাসহ সমাজ ও দেশের নানা সেক্টরের ক্ষমতাধররা যেখানে সংঘবদ্ধভাবে এই কাজগুলো করছে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কী করবে? বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির জন্য আইনশৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। নানা অপরাধচক্র কিংবা রাষ্ট্রের শক্তিধর ব্যক্তিরা দুর্নীতির নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে। আজকে দেশের অবস্থা মারাত্মক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। সুনীতি যেন আজ নির্বাসনে চলে গেছে, দুর্নীতি যেন আজ রাজার ঘরে সিংহাসনে বসে আছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।
আমরা যদি সবাই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হই, ধর্মের অনুশাসন ও নীতি-নৈতিকতাগুলো মেনে চলি, আজ আমাদের জন্য এত দুরবস্থা হয় না। আমরা কেউ সিচন্তা করি না। সত্কর্ম করি না। কাজের ভালো-মন্দ বিচার করি না। এই জন্যই তো বৌদ্ধ নীতি-দর্শনে আটটি সুন্দর নীতির কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় বৌদ্ধ পারিভাষিক অর্থে আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি পদ অনুসরণ করে চললে সেই মানবজীবন হবে ধন্য, গৌরবান্বিত। সেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ তথা দেশ হবে অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। এজন্যই সব ধর্মে সুনীতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আদর্শ ও সচ্চরিত্র গঠনের কথা।
সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ-কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ লোপাট, ডেসটিনির অবৈধ টাকা আত্মসাত্ ও পাচার, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে কিনা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে এসব দুর্নীতি সব খবরকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় এ খবর কে না জানে? আমরা যেমন অবাক হয়েছি, আমাদের মতো বিশ্বও অবাক হয়েছে। তারা ভাবছে, ছোট্ট একটা দেশে এ কী হচ্ছে?
বৌদ্ধ মতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ মঙ্গল হলো ব্যক্তির চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিচিত্ত উদার ও নির্মলীকরণ এবং মন্দ বা অকুশলবর্জিত জীবনধারণ করা। এটিই সুস্থ ও সফল জীবনধারণ করার মূল উপাদান। এই জীবনপদ্ধতি প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত সবাই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলে, অনুশীলন করলে সমাজের নানা স্তরে, রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে এবং গোটা বিশ্বের মানব জীবনে অবশ্যই সন্ত্রাস নির্মূল হবে, সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে।
অতএব আমাদের দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই ব্যক্তিকে সত্ হতে হবে। নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নিজেকে শাসন করতে হবে। বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দেশপ্রেম ও দেশের মর্যাদার জন্য নিরঙ্কুশ চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি সব অপরাধকে একটি বন্ধনীর মধ্যে আনতে হবে যেন মানবিক গুণগুলোকে জাগাতে পারি এবং পাশাপাশি আমাদের মানবিক গুণগুলোকে ব্যবহার করতে হবে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে, সর্বজায়গায়। এজন্যই আমাদের সবাইকে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এক কাতারে, সংঘবদ্ধভাবে।
প্রার্থনা করি আমাদের দেশের সব ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন, অপরাধ ও অনৈতিকতা দূরীভূত হোক। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসুক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি দুর্নীতি কীভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। এ দুর্নীতির কারণে দেশে বিরাজ করছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক এক চরম অস্থিতিশীলতা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, অর্থনৈতিক চরম দুরবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক জীবনে নানা ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অহরহ। তাই আজ আমাদের এই প্রিয় দেশটির এত করুণ দশা। এত চেষ্টার পরও আজ আমরা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। পারছি না কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতেও। চারদিকে যেন চলছে চরম এক অরাজকতা।
কেন জানি এই একটি সুন্দর দেশের প্রতি আমাদের এত অবহেলা? কী নেই আমাদের দেশে? প্রাকৃতিক আর নৈসর্গিক সম্পদভরা এদেশে নদী, সাগর, খাল-বিল, পর্বত, বিশাল সবুজ মাঠ তো আছেই; আছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল জনসম্পদও। তারপরও কেন আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নতির দিকে এগুতে পারছি না? মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না? নিজকে প্রশ্ন করি বার বার। এর উত্তর মেলে শুধু, নীতি-নৈতিকতার অভাব; আর যেন আত্মশক্তি অপব্যবহারের ব্যর্থতা। একে আরও সহজভাষায় বললে বলা যায়, এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের সমাজের নানা স্তরে অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, উেকাচ তো আছেই; এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের দেশপ্রেমের অভাববোধটুকুও। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক সঙ্কট আর অস্থিতিশীলতার বিরাট বাধাও।
দুর্নীতি বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে যেখানে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সামগ্রিক জনজীবনে। আমরা জানি, যে কোনো দেশ, সমাজ, বিশ্ব; এমনকি পরিবারও যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সেখানে কেউ আর সুস্থ ও সবলভাবে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অবস্থাও আজ তাই। সেজন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতিবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘দুর্নীতি এক মারাত্মক ব্যাধি যার আক্রমণে গোটা সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়।’
‘দুর্নীতি’ বলতে আমরা আক্ষরিক অর্থে সমাজে প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধাচরণকেই বুঝি। সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, উেকাচ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত্, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়, সম্পদের অপচয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন কিংবা নানা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপহার গ্রহণ করা প্রভৃতিই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির সঠিক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন, যেখানে ব্যক্তি তার নানা অপরাধ সংঘটিত করে অতি সংগোপনে নানাভাবে, নানা অজুহাতে, পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে। তাই বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ বলেন, ‘ওহ পড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ ধ ঢ়বত্ংড়হ রিষষভঁষষু হবমষবপঃবফ যরং ংঢ়বপরভরবফ ফঁঃু রহ ড়ত্ফবত্ ঃড় যধাব ধ ঁহফবত্ ধফাধহঃধমব.’ অর্থাত্ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার। এই অর্থে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করাকেই দুর্নীতি বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে আরও নানা সংজ্ঞা আছে। তবে সব মতের যে সিদ্ধান্ত সেটি হলো ‘ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ সবধহং ধহুঃযরহম ফড়রহম রহ ঁহঁংঁধষ ধুি.’
আমরা জানি দুর্নীতি কোনো জীবজন্তু কিংবা পশুপাখি করে না; দুর্নীতি করে মানুষ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ জীবটি। তাই শাস্ত্র বলছে, ‘যে জীবন অর্থলোলুপ, তীব্র অর্থলালসায় বিভোর সেই জীবনই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয় অধিক। তিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-জ্ঞানী, সরকারি-বেসরকারি, বিত্তশালী, ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন। আমরা বুঝি, যে জীবন অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে ধাবিত সেই জীবন দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয় বেশি। সে জীবন মানবতাকে করে ভূলুণ্ঠিত, কলুষিত। আর জাতীয় জীবনে ডেকে আনে চরম সর্বনাশা পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে প্লেটোর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে নিরর্থক।’ আমাদের দেশের আজ তাই হয়েছে।
আজ আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারলেও এর থেকে উত্তরণের পথগুলো খুঁজতে পারছি না আমরা। নেই কোনো বিচারের ব্যবস্থা, নেই কোনো শাস্তির ভয়-ভীতি এবং দণ্ডও। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশের উঁচুস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে, যেখানে সহজে হাত দেয়া যায় না। দেশের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমাসহ সমাজ ও দেশের নানা সেক্টরের ক্ষমতাধররা যেখানে সংঘবদ্ধভাবে এই কাজগুলো করছে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কী করবে? বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির জন্য আইনশৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। নানা অপরাধচক্র কিংবা রাষ্ট্রের শক্তিধর ব্যক্তিরা দুর্নীতির নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে। আজকে দেশের অবস্থা মারাত্মক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। সুনীতি যেন আজ নির্বাসনে চলে গেছে, দুর্নীতি যেন আজ রাজার ঘরে সিংহাসনে বসে আছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।
আমরা যদি সবাই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হই, ধর্মের অনুশাসন ও নীতি-নৈতিকতাগুলো মেনে চলি, আজ আমাদের জন্য এত দুরবস্থা হয় না। আমরা কেউ সিচন্তা করি না। সত্কর্ম করি না। কাজের ভালো-মন্দ বিচার করি না। এই জন্যই তো বৌদ্ধ নীতি-দর্শনে আটটি সুন্দর নীতির কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় বৌদ্ধ পারিভাষিক অর্থে আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি পদ অনুসরণ করে চললে সেই মানবজীবন হবে ধন্য, গৌরবান্বিত। সেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ তথা দেশ হবে অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। এজন্যই সব ধর্মে সুনীতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আদর্শ ও সচ্চরিত্র গঠনের কথা।
সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ-কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ লোপাট, ডেসটিনির অবৈধ টাকা আত্মসাত্ ও পাচার, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে কিনা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে এসব দুর্নীতি সব খবরকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় এ খবর কে না জানে? আমরা যেমন অবাক হয়েছি, আমাদের মতো বিশ্বও অবাক হয়েছে। তারা ভাবছে, ছোট্ট একটা দেশে এ কী হচ্ছে?
বৌদ্ধ মতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ মঙ্গল হলো ব্যক্তির চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিচিত্ত উদার ও নির্মলীকরণ এবং মন্দ বা অকুশলবর্জিত জীবনধারণ করা। এটিই সুস্থ ও সফল জীবনধারণ করার মূল উপাদান। এই জীবনপদ্ধতি প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত সবাই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলে, অনুশীলন করলে সমাজের নানা স্তরে, রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে এবং গোটা বিশ্বের মানব জীবনে অবশ্যই সন্ত্রাস নির্মূল হবে, সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে।
অতএব আমাদের দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই ব্যক্তিকে সত্ হতে হবে। নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নিজেকে শাসন করতে হবে। বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দেশপ্রেম ও দেশের মর্যাদার জন্য নিরঙ্কুশ চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি সব অপরাধকে একটি বন্ধনীর মধ্যে আনতে হবে যেন মানবিক গুণগুলোকে জাগাতে পারি এবং পাশাপাশি আমাদের মানবিক গুণগুলোকে ব্যবহার করতে হবে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে, সর্বজায়গায়। এজন্যই আমাদের সবাইকে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এক কাতারে, সংঘবদ্ধভাবে।
প্রার্থনা করি আমাদের দেশের সব ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন, অপরাধ ও অনৈতিকতা দূরীভূত হোক। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসুক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
corruption part 3
আচরণে সত্যি সচেতন হলে-
সাহস রতন | ২০ জুলাই ২০১৪, রবিবার, ১০:২৪
সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষকে প্রয়োজন ও আত্মরক্ষার তাগিদে দলগতভাবে
চলাফেরা এবং বসবাস করতে হচ্ছে যার সর্বশেষ ফলাফল হলো আজকের সমাজ ও রাষ্ট্র
ব্যবস্থা। যেহেতু ব্যক্তি মানুষ নিয়েই পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে,
তাই ব্যক্তির সচেতনতা ছাড়া উন্নত সমাজ কোনভাবেই আশা করা যায় না। অন্যভাবে
বললে, সচেতন ব্যক্তিরাই পারে উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
দুর্নীতিমুক্ত, স্বনির্ভর ও উন্নত সমাজ গড়তে হলে প্রথমেই রাষ্ট্রের প্রধান
সম্পদ, তার জনগণকে, সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। জনগণের ‘কনশাসনেস লেভেল’ একটি
গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনের নানাবিধ
সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো তার অসচেতন জনগোষ্ঠী। অনেকেই
আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন তবে বাস্তব কিছু উদাহরণ উপস্থাপনের মধ্য
দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।প্রথমেই নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ কয়েকটি উদাহরণ দিই। বেশ কিছু দিন আগে সান্ধ্যকালীন আড্ডা থেকে বাসায় ফিরছি। রাত ন’টার মতো হবে। গাড়ি ড্রাইভ করে গ্রীন রোড-পান্থপথ সিগন্যাল থেকে ডানে মোড় দিয়ে সোনারগাঁও সিগন্যালের দিকে এগোচ্ছি। এর মধ্যে হঠাৎ পেছন থেকে ‘ধর ধর’ চিৎকারের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একজন ট্রাফিক পুলিশ; ‘ওই ছিনতাইকারী- ধর ধর’ বলে চিৎকার করে একজনকে পেছন থেকে ধাওয়া করছে। আর যার উদ্দেশ্যে বলা, সেই অল্পবয়সী ছেলেটি, কখনও রাস্তার মাঝের ডিভাইডারের উপর দিয়ে, কখনও বা চলতে থাকা গাড়ির ফাঁক গলে দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করছে। ফলে উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসতে থাকা পথচারীর মুখোমুখি হচ্ছে। পুরো দৃশ্যটি ঘটলো আমার মতো আরও অনেকের চোখের সামনে কিন্তু আশ্চর্য আমরা কেউই ছিনতাইকারীটিকে আটকাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করিনি। ওকে জাপটে ধরারও প্রয়োজন ছিল না, শুধু আলতো একটা ল্যাং দিলেই ছিটকে পড়তো রাস্তায়। আর পেছন থেকে ধেয়ে আসা পুলিশটি অনায়াসে তাকে ধরতে পারতো। এটুকু দায়িত্ব সচেতন না হলো কিভাবে চলবে! আমার প্রসঙ্গ ‘সচেতন ব্যক্তি মানেই উন্নত সমাজ।’ আমি মনে করি ব্যক্তিকে সচেতন করে গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের জাতীয় জীবনে ভাল কোন কিছুই ঘটবে না।
তেলের দাম বেড়েছে কিন্তু আগেই বাস ভাড়া দূরত্বের তুলনায় বেশি হয়ে আছে বলে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাসভাড়া বাড়ানো যাবে না। তারপরও কন্ডাক্টর ৫ টাকা বেশি বাড়া চাইছে এবং বেশির ভাগ যাত্রীই দু’একবার গ্যাঁ-গোঁ করে তা দিয়েও দিচ্ছে। কেউ একজন বেঁকে বসলো ন্যায্য কারণেই। তার কথা হলো- ‘খবরের কাগজে পড়েছি, টিভিতে নিউজ দেখেছি, ভাড়া বাড়ানো যাবে না, তারপরও বেশি বাড়া চাও কেন?’ উত্তরে কন্ডাক্টরের জবাব- ‘আফনে গিয়া মালিকরে জিগান। মালিক আমারে কইয়া দিছে ৫ টাকা বেশি নিতে, আমি কম নিবার পারুম না।’ মালিক-শ্রমিক এ চক্রটি সুযোগ পেলেই যে কারণে বা অকারণে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে, এটি তো আর কারও অজানা নয়। তারপরও একজন যাত্রী এটির প্রতিবাদ করছে দেখেও বাকিরা চুপ মেরে থাকছে। কখনও এমনও হয়, পাশের যাত্রী বলে ওঠে- ‘আরে ভাই দিয়া দেন তো, খামোখা ঝামেলা করে কি হবে? সবাই তো দিয়ে দিচ্ছে দেখেন না? আপনি একা কি করবেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে হয়তো গাড়ি সাইড করে আপনাকে নামিয়েই দিবে।’ ভেবে দেখুন তো একবার, আমরা দিনের পর দিন এভাবেই অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছি না? বাসে ত্রিশের অধিক যাত্রী থাকার পরও মাত্র একজন কন্ডাক্টরের অন্যায় আবদারের কাছে নতি স্বীকার করছে সবাই। এভাবে চললে কোনদিনই এসব অন্যায়-অবিচার বন্ধ হবে না। কিন্তু এমন যদি হতো, পাঁচ টাকা বেশি চাওয়ার পর বেশির ভাগ যাত্রীই সেটি না দিয়ে প্রতিবাদ করছে, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এমনটি এত সহজে ঘটতো না। আমরা কখনও চেষ্টা করেও দেখিনি, তাই না?
ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কে সারা বছরই খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। ওয়াসার ড্রেনেজ ডিভিশন আন্ডারগ্রাইন্ড সুয়্যারেজ পাইপ বসানের কাজ শেষ করে যাওয়ার পর মিউনিসিপাল করপোরেশন রাস্তার উপরের অংশের বিটুমিনাস কার্পেটিং কাজ সম্পন্ন করবে। এর মাস খানেক পর টেলিফোন কোম্পানী আসবে নতুন ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ লাইনের কাজ করার জন্য। যার ফলস্বরূপ আবারও কেবলই মাত্র নির্মিত রাস্তাটি কাটা হবে। টেলিফোন কোম্পানির কাজ শেষ হবার পর মিউনিসিপাল করপোরেশন আবার রাস্তাটি মেরামত করবে এবং তারও ক’মাস পর আসবে তিতাস গ্যাস কোম্পানি গ্যাস লাইনের কাজ করার জন্য। সমন্বয়হীনতার কথা বলে জনগণ প্রদত্ত ট্যাক্সের টাকা লুটপাট করে এসব দুর্নীতি দিনের আলোয় আমাদের চোখের সামনে ঘটছে বছরের পর বছর। এ রাস্তাটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, আমি-আপনি আসা-যাওয়া করছি। প্রত্যেকে নিজেদের অনেক সচেতন হিসেবে ভাবছি। কিন্তু কোন দিন একজনও কি জিজ্ঞেস করেছি- কি ব্যাপার? পনেরো দিন আগেই না রাস্তাটি মেরামত করা হলো, আবার কেন এটি কাটাকাটি হচ্ছে? প্রথমবার কাটার সময় এক সঙ্গে সব কাজ শেষ হলো না কেন? আমার বিশ্বাস, রাস্তায় চলমান একশ’ জন পথচারীও যদি দৈনিক এ প্রতিবাদটি করতো তাহলে এ অন্যায়টি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যেতো। কেন সবগুলো কাজ একসঙ্গে হলো না? কর্মরত শ্রমিক কিংবা ঠিকাদার যেই হোক না কেন, প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখোমুখি হলে এতসব অন্যায়-অবিচার অনায়াসে এভাবে চালাতে পারতো না।
অনেকগুলো বাস্তব উদাহরণের পর এবার একটা অন্যরকম দৃশ্য কল্পনা করা যাক। মি. মফিজ, সামান্য খুচরা ব্যবসায়ী তবে তিনি একজন নিয়মিত করদাতা। তো তার একটি সমস্যা নিয়ে পার্শ্ববর্তী থানায় গেলেন জিডি করতে। থানার অভ্যর্থনা কক্ষে উপস্থিত হতেই ডিউটিরত অফিসারটি অত্যন্ত সুন্দর করে সালাম দিয়ে স্বাগত জানিয়ে বললো- স্যার কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি? -আমি এসেছি একটা জিডি করতে। আমার বাসার পাশের মাঠে গত দু’দিন ধরে রাতভর উচ্চস্বরে মাইক বাজতেছে। পুরো এলাকার মানুষজন বিশেষ করে বয়স্করা ভীষণ বিরক্ত। অনেকেই এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, শব্দ দূষণের ফলে পর্যাপ্ত ঘুমুতে না পারার কারণে। এ বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখবেন? -স্যার, আপনি এখানটায় বসুন। আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। আপনার নাম ঠিকানা কিছুই প্রয়োজন নেই, আপনি শুধু যেখানটায় এমনটা ঘটছে ওখানকার লোকেশন আমাকে বলুন স্যার, আমি এক্ষুণি জিডি এন্ট্রি করছি- বলে অফিসারটি চেয়ার টেনে দিলো। পুলিশ অফিসারটির মুখে বার বার স্যার শুনে এবং চেয়ার এগিয়ে দিচ্ছে দেখে মি. মফিজ কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে- আরে না না ঠিক আছে, আমি সামান্য খুচরা ব্যবসায়ী, আমাকে স্যার বলতে হবে না- বলে নিজেই চেয়ার টেনে বসলেন। অফিসারটি আরও কাঁচুমাচু হয়ে বললো- কি যে বলেন স্যার; আপনাকেই তো স্যার বলতে হবে। আপনি ও আপনার মত আরও অনেক করদাতাদের প্রদত্ত কর থেকেই তো আমার বেতন-ভাতা হচ্ছে। আমি বউ-বাচ্চা নিয়ে খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি। আপনারাই তো আমার এমপ্লয়ার। আপনাকে স্যার বলে সম্বোধন করাটা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ।
দৃশ্যটি কাল্পনিক কিন্তু এমনটাই তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল, নয় কি? সমস্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা তো জনগণকেই দিতে হচ্ছে, কখনও ট্যাক্স বা ভ্যাট বা আয়কর হিসেবে। কোথায় ওরা আমাকে স্যার স্যার করবে, তা না, আমি বোকার মতো আমার নিজের ক্ষমতা ও অবস্থান সম্পর্কে অসচেতন বলেই আমার নিয়োগকৃত কর্মচারীকে স্যার বলে সম্বোধন করছি। স্যার বলাটা কোন খারাপ কিছু না কিন্তু যে ভঙ্গিতে বলা হচ্ছে সেটিতেই আপত্তি। বিষয়টি যত তাড়াতাড়ি আমাদের বোধগম্য হবে তত দ্রুত আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।
বাংলাদেশের জনগণ, আমরা; প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন এলে একবার জাগ্রত হই। অতঃপর পাঁচ বছরের জন্য শীত নিদ্রায় চলে যাই। এই সময়ের মধ্যে কোন ধরনের অন্যায়-অবিচার-রাহাজানিই আমাদেরকে কোন ভাবেই ছুঁয়ে যায় না। গ-ারের চেয়েও বেশি সহনশীল হয়ে গেছি আমরা। অতি মাত্রায় সহনশীলতা আমাদের শুধু পিছিয়েই দেয় নি উপরন্তু, দুর্নীতিবাজ-চোরাগোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক বেশি। এ অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিজেকে জাগ্রত রাখতে হবে প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ। অন্যায়-অবিচার-ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। নিজে সত্যিকার অর্থেই সচেতন ব্যক্তির মতো আচরণ করতে হবে। তবেই কেবল সমৃদ্ধি আসবে, উন্নতি ঘটবে রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে।
আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হলে, নিকট ভবিষ্যতে একটি উন্নত ও আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ পাওয়া খুব কঠিন কি?
corruption {collected}
ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ হবে কবে?সমাজের
প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে
নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার
সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর
দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই।মীর আব্দুল আলীম
আমাদের
আইনমন্ত্রী বললেন, 'আদালতের ইটেও ঘুষ খায়।' অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলার
জন্য মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। যেখানে দেশ এবং
রাজনীতিতে সত্যের আকাল সেখানে মন্ত্রীবচন বাণীর মতোই মনে হচ্ছে। রাষ্ট্রের
অন্যতম জায়গা এই বিচার বিভাগ। এই বিচার বিভাগকে নিয়ে একজন মন্ত্রীর এমন
মন্তব্য থেকে বোঝা যায় দেশের ঘুষ দুর্নীতি কোন স্তরে রয়েছে। গত ১০ জুলাইয়ের
জাতীয় দৈনিকগুলোতে দুর্নীতি বিষয়ক টিআইর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও ভূমি সেবায় উদ্বেগজনক হারে
দুর্নীতি বেড়েছে বলে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন। বাংলাদেশে দুর্নীতি
বেড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতির শীর্ষস্থানে রয়েছে। ৯৩ শতাংশের
ধারণা, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ খাত বা প্রতিষ্ঠান হলো-রাজনৈতিক
দল ও পুলিশ। আর ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এর পরের খাতই হলো
বিচারব্যবস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি
খাতে দুর্নীতি খুবই গুরুতর সমস্যা। তবে ৯২ শতাংশ মানুষই মনে করেন, সাধারণ
মানুষ দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারেন ও তারা কোনো না কোনোভাবে
ভূমিকা রাখতে চান। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, উত্তরদাতারা নিজেদের অভিজ্ঞতায়
দেখেছেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি, বিচার, কর এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি কিছুটা
কমেছে। বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিমাপ জরিপ ২০১২-এর প্রতিবেদনে এমনই তথ্য দেয়া
হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এসব তথ্য প্রকাশ
করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কোনো অতিরঞ্জিত ফলাফলে দুর্নীতির এ
মুকুট আমাদের উপহার দিচ্ছে না। এটা যে আমাদেরই প্রাপ্য।
যতদুর বুঝি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আমাদের জনগণের ব্যাপক হতাশাবোধকেই (যা অনেকটাই প্রতিদিনকার পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট কিংবা সাধারণ জনগণের আলোচনায় উঠে আসে) কেবল তুলে ধরেছে। পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি দুর্নীতি আছে, এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে এই দুর্নীতি যা আগেই বলেছি, জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাবোধের মূল কারণ হচ্ছে যে, দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকর ভূমিকা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। একটি গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থার প্রধানতম ভিত্তি হওয়ার কথা এসব প্রতিষ্ঠানের। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, সংবাদ মাধ্যম, সরকারি ও বেসরকারি আমলাতন্ত্র, জাতীয় সংসদ, সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিখাত। আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্রমে ধ্বংস বা অকার্যকর করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চালিত করেছি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে যে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্নীতি।
১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার রচিত 'মুচিরাম গুড়' নামক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, 'বাঙ্গালা দেশে মনুষ্যত্ব বেতনের ওজনে নির্ণীত হয়। কে কত বড় বাঁদর তার লেজ মাপিয়া ঠিক করিতে হয়।' তখনকার কেরানী আর চাপরাশিদের চুরিচামারি করে সামান্য ঘুষ গ্রহণের নমুনা দেখেই তিনি লিখেছেন 'এমন অধঃপতন আর কোনো দেশের হয় নাই।' ভাগ্যিস বেঁচে নেই সেই সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এদেশের দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে তার লেখনিতে মহাপ্রলয় ঘটিয়ে ছাড়তেন। হালে দেশে দুর্নীতির আর ঘুষের অবাধ স্বাধীনতায় সাধারণ মানুষ হতাশা করেছে। আমরা ভাগ্যাহত এ কারণে এ দেশের জ্ঞান পাপিরা শিক্ষার পাহাড় মাথায় নিয়ে নির্বিচারে নির্লজ্জ ঘুষ গ্রহণ করে চলেছে। আরো হতবাক হই যখন দেখি দেশের নীতিনির্ধারক রাজনৈতিক, আমলা, মন্ত্রী, এমপিদের হরেদরে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ পত্র-পত্রিকায় দেখে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত কবিতার দু'টি চরণ মনে পড়ছে আমার 'তিনভাগ গ্রাসিয়াছো একভাগ বাকী/সুরা নাই পাত্র হাতে কাঁপিতেছে সাকী। দেশের যা অবস্থা তাতে অবশিষ্ট বোধ করি ১ ভাগও নেই। পদ্মা সেতুর তদন্তাধীন দুর্নীতি প্রমাণ হোক আর নাই হোক সারা বিশ্বের দরবারে ইজ্জত যা নষ্ট হওয়ার তাতো হয়েই গেছে। কালো বিড়ালের মহান আবিষ্কারক সুরঞ্জিত দাদার কারণে জাতির পিতার গড়া আওয়ামী লীগের ইজ্জতও কম নষ্ট হয়নি। তিন বছর আগ পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বাৎসরিক প্রতিবেদনে পাঁচ বছর এক নাগাড়ে বাংলাদেশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে অভিহিত করেছে। এমনিতেই দেশের সব মানুষই সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির দৌরাত্ম্যের সাথে কমবেশি পরিচিত, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতির দায়ে অপদস্থ হওয়ায় দেশের সব সচেতন মানুষের মনে এক ব্যাপক গ্লানিবোধ সঞ্চারিত হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশের কিংবা ওইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশিদের কেমন যেন পালিয়ে থাকার মতো অবস্থা। পরিস্থিতি এতই নৈরাশ্যজনক যে, রাষ্ট্র এবং সুশীল সমাজ দুর্নীতির এই বিস্তার প্রতিরোধে ক্রমাগত উদ্যমহীন হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলোও তার বাইরে নয়। স্ত্রী প্রশ্ন করছে না, স্বামীর হঠাৎ টাকা প্রাপ্তির উৎস কি? প্রশ্ন করছেন না পিতা-মাতা বা সন্তানরাও। প্রার্থনাগারের হুজুরও যেন 'ছলে বলে কৌশলে' টাকার পাহাড় গড়া ব্যক্তিটির মঙ্গল কামনায় বারবার কেঁদে ওঠেন।
দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে যে কেন দুর্নীতি হয় বা দুর্নীতি বিস্তারের প্রক্রিয়া কীভাবে বৃদ্ধি পায়। সার্বিকভাবে দেখলে দুর্নীতির ব্যাপকতার সাথে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি সম্পর্ক আছে। একথার সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় যে, কেবল মূল্যবোধের অবক্ষয় বাংলাদেশের দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কেননা দুর্নীতি পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা জনগণের মনে যে পরিমাণ হতাশার সৃষ্টি করে তা তুলনাহীন। দুর্নীতি কেবল ওপর মহলে হয় তাই নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এই অংশগ্রহণের কারণ সব ক্ষেত্রেই শুধু লোভ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে নূ্যনতম জীবনযাপনের প্রচেষ্টা। এই অসহায়ত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃষ্টান্তের, যেখানে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির সুযোগ নেই বরং জনগণকে মূল্য দিতে হয় সৎ থাকার জন্য। জনগণের কাছে এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেআইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। জনগণের মনে এই ধারণা যত ক্রমবিকাশমান হচ্ছে, হতাশা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপতা তত বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এই হতাশার ফল ধরে আমরা হয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ।
বাংলাদেশ একটি প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ- এই ধারণাটি সৃষ্টি হয়েছে দেশের আমজনতার মনে, কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালনের অবকাশ রাখেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা দেশের জনগণের মনে তীব্র হতাশার সৃষ্টি করেছে, দুর্নীতির পথে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সৃষ্টি করেছে বাধা। যতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে না, সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক দৌরাত্ম্যের প্রতাপ আমাদের দেখে যেতে হবে। দুর্নীতির যে ধারণা আমরা সৃষ্টি করেছি, সেই ধারণাকে বদলাতে হবে আমাদেরই। আর তা করতে হবে কথাকে কাজে পরিণত করার মাধ্যমে। বাংলা নামের এদেশ আমাদের সবার, তাই আমাদের সবার মিলিত প্রতিরোধে সমাজের সব অনাচার দূর করা সম্ভব।এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সঠিক ভূমিকা থাকতে হবে। আর এসব বিষয়ে সরকার জনতার ন্যায্য সমর্থন পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সরকারের সাফল্যের অনেক নজির আছে তা না স্বীকার করার জো নেই। শত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে গত দুই বছরে মন্ত্রী-এমপি ও তার সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ দুর্নীতির তালিকা কম নয়। ক্রমেই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা সরকারের অর্জনগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে।
সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই।
মীর আব্দুল আলীম: সাংবাদিক, কলাম লেখক, নিউজ-বাংলাদেশ ডটকমের সম্পাদক
হবংিংঃড়ৎব০৯@ুধযড়ড়.পড়স
আমাদের
আইনমন্ত্রী বললেন, 'আদালতের ইটেও ঘুষ খায়।' অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলার
জন্য মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। যেখানে দেশ এবং
রাজনীতিতে সত্যের আকাল সেখানে মন্ত্রীবচন বাণীর মতোই মনে হচ্ছে। রাষ্ট্রের
অন্যতম জায়গা এই বিচার বিভাগ। এই বিচার বিভাগকে নিয়ে একজন মন্ত্রীর এমন
মন্তব্য থেকে বোঝা যায় দেশের ঘুষ দুর্নীতি কোন স্তরে রয়েছে। গত ১০ জুলাইয়ের
জাতীয় দৈনিকগুলোতে দুর্নীতি বিষয়ক টিআইর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও ভূমি সেবায় উদ্বেগজনক হারে
দুর্নীতি বেড়েছে বলে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন। বাংলাদেশে দুর্নীতি
বেড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতির শীর্ষস্থানে রয়েছে। ৯৩ শতাংশের
ধারণা, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ খাত বা প্রতিষ্ঠান হলো-রাজনৈতিক
দল ও পুলিশ। আর ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এর পরের খাতই হলো
বিচারব্যবস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি
খাতে দুর্নীতি খুবই গুরুতর সমস্যা। তবে ৯২ শতাংশ মানুষই মনে করেন, সাধারণ
মানুষ দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারেন ও তারা কোনো না কোনোভাবে
ভূমিকা রাখতে চান। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, উত্তরদাতারা নিজেদের অভিজ্ঞতায়
দেখেছেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি, বিচার, কর এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি কিছুটা
কমেছে। বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিমাপ জরিপ ২০১২-এর প্রতিবেদনে এমনই তথ্য দেয়া
হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এসব তথ্য প্রকাশ
করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কোনো অতিরঞ্জিত ফলাফলে দুর্নীতির এ
মুকুট আমাদের উপহার দিচ্ছে না। এটা যে আমাদেরই প্রাপ্য।যতদুর বুঝি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আমাদের জনগণের ব্যাপক হতাশাবোধকেই (যা অনেকটাই প্রতিদিনকার পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট কিংবা সাধারণ জনগণের আলোচনায় উঠে আসে) কেবল তুলে ধরেছে। পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি দুর্নীতি আছে, এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে এই দুর্নীতি যা আগেই বলেছি, জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাবোধের মূল কারণ হচ্ছে যে, দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকর ভূমিকা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। একটি গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থার প্রধানতম ভিত্তি হওয়ার কথা এসব প্রতিষ্ঠানের। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, সংবাদ মাধ্যম, সরকারি ও বেসরকারি আমলাতন্ত্র, জাতীয় সংসদ, সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিখাত। আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্রমে ধ্বংস বা অকার্যকর করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চালিত করেছি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে যে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্নীতি।
১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার রচিত 'মুচিরাম গুড়' নামক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, 'বাঙ্গালা দেশে মনুষ্যত্ব বেতনের ওজনে নির্ণীত হয়। কে কত বড় বাঁদর তার লেজ মাপিয়া ঠিক করিতে হয়।' তখনকার কেরানী আর চাপরাশিদের চুরিচামারি করে সামান্য ঘুষ গ্রহণের নমুনা দেখেই তিনি লিখেছেন 'এমন অধঃপতন আর কোনো দেশের হয় নাই।' ভাগ্যিস বেঁচে নেই সেই সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এদেশের দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে তার লেখনিতে মহাপ্রলয় ঘটিয়ে ছাড়তেন। হালে দেশে দুর্নীতির আর ঘুষের অবাধ স্বাধীনতায় সাধারণ মানুষ হতাশা করেছে। আমরা ভাগ্যাহত এ কারণে এ দেশের জ্ঞান পাপিরা শিক্ষার পাহাড় মাথায় নিয়ে নির্বিচারে নির্লজ্জ ঘুষ গ্রহণ করে চলেছে। আরো হতবাক হই যখন দেখি দেশের নীতিনির্ধারক রাজনৈতিক, আমলা, মন্ত্রী, এমপিদের হরেদরে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ পত্র-পত্রিকায় দেখে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত কবিতার দু'টি চরণ মনে পড়ছে আমার 'তিনভাগ গ্রাসিয়াছো একভাগ বাকী/সুরা নাই পাত্র হাতে কাঁপিতেছে সাকী। দেশের যা অবস্থা তাতে অবশিষ্ট বোধ করি ১ ভাগও নেই। পদ্মা সেতুর তদন্তাধীন দুর্নীতি প্রমাণ হোক আর নাই হোক সারা বিশ্বের দরবারে ইজ্জত যা নষ্ট হওয়ার তাতো হয়েই গেছে। কালো বিড়ালের মহান আবিষ্কারক সুরঞ্জিত দাদার কারণে জাতির পিতার গড়া আওয়ামী লীগের ইজ্জতও কম নষ্ট হয়নি। তিন বছর আগ পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বাৎসরিক প্রতিবেদনে পাঁচ বছর এক নাগাড়ে বাংলাদেশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে অভিহিত করেছে। এমনিতেই দেশের সব মানুষই সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির দৌরাত্ম্যের সাথে কমবেশি পরিচিত, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতির দায়ে অপদস্থ হওয়ায় দেশের সব সচেতন মানুষের মনে এক ব্যাপক গ্লানিবোধ সঞ্চারিত হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশের কিংবা ওইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশিদের কেমন যেন পালিয়ে থাকার মতো অবস্থা। পরিস্থিতি এতই নৈরাশ্যজনক যে, রাষ্ট্র এবং সুশীল সমাজ দুর্নীতির এই বিস্তার প্রতিরোধে ক্রমাগত উদ্যমহীন হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলোও তার বাইরে নয়। স্ত্রী প্রশ্ন করছে না, স্বামীর হঠাৎ টাকা প্রাপ্তির উৎস কি? প্রশ্ন করছেন না পিতা-মাতা বা সন্তানরাও। প্রার্থনাগারের হুজুরও যেন 'ছলে বলে কৌশলে' টাকার পাহাড় গড়া ব্যক্তিটির মঙ্গল কামনায় বারবার কেঁদে ওঠেন।
দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে যে কেন দুর্নীতি হয় বা দুর্নীতি বিস্তারের প্রক্রিয়া কীভাবে বৃদ্ধি পায়। সার্বিকভাবে দেখলে দুর্নীতির ব্যাপকতার সাথে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি সম্পর্ক আছে। একথার সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় যে, কেবল মূল্যবোধের অবক্ষয় বাংলাদেশের দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কেননা দুর্নীতি পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা জনগণের মনে যে পরিমাণ হতাশার সৃষ্টি করে তা তুলনাহীন। দুর্নীতি কেবল ওপর মহলে হয় তাই নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এই অংশগ্রহণের কারণ সব ক্ষেত্রেই শুধু লোভ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে নূ্যনতম জীবনযাপনের প্রচেষ্টা। এই অসহায়ত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃষ্টান্তের, যেখানে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির সুযোগ নেই বরং জনগণকে মূল্য দিতে হয় সৎ থাকার জন্য। জনগণের কাছে এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেআইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। জনগণের মনে এই ধারণা যত ক্রমবিকাশমান হচ্ছে, হতাশা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপতা তত বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এই হতাশার ফল ধরে আমরা হয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ।
বাংলাদেশ একটি প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ- এই ধারণাটি সৃষ্টি হয়েছে দেশের আমজনতার মনে, কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালনের অবকাশ রাখেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা দেশের জনগণের মনে তীব্র হতাশার সৃষ্টি করেছে, দুর্নীতির পথে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সৃষ্টি করেছে বাধা। যতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে না, সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক দৌরাত্ম্যের প্রতাপ আমাদের দেখে যেতে হবে। দুর্নীতির যে ধারণা আমরা সৃষ্টি করেছি, সেই ধারণাকে বদলাতে হবে আমাদেরই। আর তা করতে হবে কথাকে কাজে পরিণত করার মাধ্যমে। বাংলা নামের এদেশ আমাদের সবার, তাই আমাদের সবার মিলিত প্রতিরোধে সমাজের সব অনাচার দূর করা সম্ভব।এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সঠিক ভূমিকা থাকতে হবে। আর এসব বিষয়ে সরকার জনতার ন্যায্য সমর্থন পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সরকারের সাফল্যের অনেক নজির আছে তা না স্বীকার করার জো নেই। শত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে গত দুই বছরে মন্ত্রী-এমপি ও তার সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ দুর্নীতির তালিকা কম নয়। ক্রমেই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা সরকারের অর্জনগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে।
সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই।
মীর আব্দুল আলীম: সাংবাদিক, কলাম লেখক, নিউজ-বাংলাদেশ ডটকমের সম্পাদক
হবংিংঃড়ৎব০৯@ুধযড়ড়.পড়স
Subscribe to:
Comments (Atom)