শেখ
আতাউর রহমান : যে নীতি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিপদগ্রস্ত করে তাকে সহজ
কথায় দুর্নীতি বলা যায়। এর বিপরীতে সুনীতি মানুষের শুভ ও কল্যাণের পথকে
করে প্রশস্ত। মোটকথা, অপরের স্বার্থ ও অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল নিজের
স্বার্থ ও অধিকার হাসিলের লক্ষ্যে কাজ করাকেই বলে দুর্নীতি। দুর্নীতির
ইতিহাস অনেক পুরনো। সভ্যতার সূচনালগ্নের পূর্ব থেকে আদিম মানুষের যুগ থেকে
দুর্নীতির উদ্ভব। আদিম যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এক অঞ্চলে যখন মানুষের
খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চলে
ক্ষমতাবান গোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হতো। পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করে এক গোত্র
অন্য গোত্রের পাথরের অস্ত্রের মোকাবিলা করত। সঙ্গত কারণেই দুর্বল গোত্র
ক্ষমতাবান গোত্রের কাছে পরাজিত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিত। মূলত মানুষের অভাব
বা প্রয়োজন আদিম মানুষকে এরকম অশুভ ও অকল্যাণময় কাজে তাড়িত করে। এসব আমরা
নৃতত্ত্ব ও সভ্যতার ইতিহাস থেকে জেনেছি। বস্তুত প্রয়োজন আইন মানে না, অভাবে
স্বভাব নষ্ট (ঘবপবংংরঃু শহড়ংি হড় ষধ)ি — এসব কিছুই কি আদিম মানুষ থেকে
সভ্য মানুষকেও তাড়িত করছে দুর্নীতির দিকে? এই প্রশ্নের জবাবে মনীষীরা
বলেছেন নানা কথা। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানী আল বেরুনী (৯৭৩-১০৪৮
খ্রি.) বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের গুণাবলীকে দোষে পরিণত করে।’ আবার কোনো
কোনো মনীষী বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের সব গুণ নষ্ট করে দেয়।’ অতএব কোনো
গরিব মানুষ কখনো শুভ চিন্তা করতে পারে না, সে কেবল নিজের আখের গোছাতে
ব্যস্ত থাকে। অন্যের শুভ কামনা করা বা কল্যাণ করার মতো ফুরসত তার নেই। তবে
গরিবের মধ্যেও শুভ চিন্তক আছেন আর ধনীর মধ্যে সে অশুভ চিন্তক নেই, তা বলা
যাবে না এবং কোনো কোনো ধনী লোক মানুষের অকল্যাণ করে থাকেন। ইতিহাস পাঠে
জানা যায়— ইংল্যান্ড উন্নত হয়েছে গরিব মানুষের শ্রমে। ইংল্যান্ডের গরিব
মানুষ শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কাজ করেছেন, দেশ গড়েছেন। অভাবে স্বভাব নষ্ট
বা অভাবের তাড়নায় মানুষ হয় দুর্নীতিবাজ। এ কথার কিছুটা সত্যতা আমরা সমাজের
গরিব লোক, গরিব পরিবার এবং তৃতীয় বিশ্বের গরিব রাষ্ট্রের মানুষের দৈনন্দিন
অহিতকর কার্যকলাপ থেকে উপলব্ধি করি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাধরেরাই
করেছে দুর্নীতি। আজকের উন্নত দেশ ইংল্যান্ডের রাজা ও ভূস্বামীরা ষোলো শতক
বা তার পূর্বে যে গণঅত্যাচার তথা দুর্নীতি করেছেন তা আমাদের দেশের
শাসক-আমলার দুর্নীতি থেকে আরও ভয়াবহ। কার্ল মার্কস তার ‘ডাস ক্যাপিটাল’
গ্রন্থে সেই গণঅত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরেছেন এভাবে: ‘ষষ্ঠ এডওয়ার্ডের
রাজত্বের প্রথম বছর ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে একটি বিধানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে,
কেউ কাজ করতে আপত্তি করলে যে লোক সেই সংবাদটা জানাবে, তার কাছে গোলাম
হিসেবে থাকার দণ্ড পাবে। ... চাবুক আর শেকল দিয়ে তাকে যে কোনো কাজ করতে
বাধ্য করার অধিকার থাকবে মনিবের, তা সে কাজটা যত জঘন্যই হোক। গোলাম যদি এক
পক্ষকাল অনুপস্থিত থাকে, তাহলে যাবজ্জীবন গোলামিতে দণ্ডিত হবে এবং তার
কপালে বা পিঠে ঝ (ঝষধাব) জ্বলন্ত লৌহ শলাকা দ্বারা দেগে দেয়া হবে। তিনবার
সে যদি পালায়, তাহলে দুর্বৃত্ত হিসেবে তার প্রাণদণ্ড হবে...। কোনো ভবঘুরেকে
যদি বিনা কাজে তিনদিন ধরে ঘুরতে দেখা যায়, তাহলে তার জন্মস্থানে নিয়ে গিয়ে
গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে ঠ অক্ষর দেগে দেয়া হবে...।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
শেখ
আতাউর রহমান : যে নীতি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিপদগ্রস্ত করে তাকে সহজ
কথায় দুর্নীতি বলা যায়। এর বিপরীতে সুনীতি মানুষের শুভ ও কল্যাণের পথকে
করে প্রশস্ত। মোটকথা, অপরের স্বার্থ ও অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল নিজের
স্বার্থ ও অধিকার হাসিলের লক্ষ্যে কাজ করাকেই বলে দুর্নীতি। দুর্নীতির
ইতিহাস অনেক পুরনো। সভ্যতার সূচনালগ্নের পূর্ব থেকে আদিম মানুষের যুগ থেকে
দুর্নীতির উদ্ভব। আদিম যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এক অঞ্চলে যখন মানুষের
খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চলে
ক্ষমতাবান গোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হতো। পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করে এক গোত্র
অন্য গোত্রের পাথরের অস্ত্রের মোকাবিলা করত। সঙ্গত কারণেই দুর্বল গোত্র
ক্ষমতাবান গোত্রের কাছে পরাজিত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিত। মূলত মানুষের অভাব
বা প্রয়োজন আদিম মানুষকে এরকম অশুভ ও অকল্যাণময় কাজে তাড়িত করে। এসব আমরা
নৃতত্ত্ব ও সভ্যতার ইতিহাস থেকে জেনেছি। বস্তুত প্রয়োজন আইন মানে না, অভাবে
স্বভাব নষ্ট (ঘবপবংংরঃু শহড়ংি হড় ষধ)ি — এসব কিছুই কি আদিম মানুষ থেকে
সভ্য মানুষকেও তাড়িত করছে দুর্নীতির দিকে? এই প্রশ্নের জবাবে মনীষীরা
বলেছেন নানা কথা। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানী আল বেরুনী (৯৭৩-১০৪৮
খ্রি.) বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের গুণাবলীকে দোষে পরিণত করে।’ আবার কোনো
কোনো মনীষী বলেছেন, ‘দারিদ্র্য মানুষের সব গুণ নষ্ট করে দেয়।’ অতএব কোনো
গরিব মানুষ কখনো শুভ চিন্তা করতে পারে না, সে কেবল নিজের আখের গোছাতে
ব্যস্ত থাকে। অন্যের শুভ কামনা করা বা কল্যাণ করার মতো ফুরসত তার নেই। তবে
গরিবের মধ্যেও শুভ চিন্তক আছেন আর ধনীর মধ্যে সে অশুভ চিন্তক নেই, তা বলা
যাবে না এবং কোনো কোনো ধনী লোক মানুষের অকল্যাণ করে থাকেন। ইতিহাস পাঠে
জানা যায়— ইংল্যান্ড উন্নত হয়েছে গরিব মানুষের শ্রমে। ইংল্যান্ডের গরিব
মানুষ শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কাজ করেছেন, দেশ গড়েছেন। অভাবে স্বভাব নষ্ট
বা অভাবের তাড়নায় মানুষ হয় দুর্নীতিবাজ। এ কথার কিছুটা সত্যতা আমরা সমাজের
গরিব লোক, গরিব পরিবার এবং তৃতীয় বিশ্বের গরিব রাষ্ট্রের মানুষের দৈনন্দিন
অহিতকর কার্যকলাপ থেকে উপলব্ধি করি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাধরেরাই
করেছে দুর্নীতি। আজকের উন্নত দেশ ইংল্যান্ডের রাজা ও ভূস্বামীরা ষোলো শতক
বা তার পূর্বে যে গণঅত্যাচার তথা দুর্নীতি করেছেন তা আমাদের দেশের
শাসক-আমলার দুর্নীতি থেকে আরও ভয়াবহ। কার্ল মার্কস তার ‘ডাস ক্যাপিটাল’
গ্রন্থে সেই গণঅত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরেছেন এভাবে: ‘ষষ্ঠ এডওয়ার্ডের
রাজত্বের প্রথম বছর ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে একটি বিধানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে,
কেউ কাজ করতে আপত্তি করলে যে লোক সেই সংবাদটা জানাবে, তার কাছে গোলাম
হিসেবে থাকার দণ্ড পাবে। ... চাবুক আর শেকল দিয়ে তাকে যে কোনো কাজ করতে
বাধ্য করার অধিকার থাকবে মনিবের, তা সে কাজটা যত জঘন্যই হোক। গোলাম যদি এক
পক্ষকাল অনুপস্থিত থাকে, তাহলে যাবজ্জীবন গোলামিতে দণ্ডিত হবে এবং তার
কপালে বা পিঠে ঝ (ঝষধাব) জ্বলন্ত লৌহ শলাকা দ্বারা দেগে দেয়া হবে। তিনবার
সে যদি পালায়, তাহলে দুর্বৃত্ত হিসেবে তার প্রাণদণ্ড হবে...। কোনো ভবঘুরেকে
যদি বিনা কাজে তিনদিন ধরে ঘুরতে দেখা যায়, তাহলে তার জন্মস্থানে নিয়ে গিয়ে
গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে ঠ অক্ষর দেগে দেয়া হবে...।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেচার স্কর্চ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, ‘নিজেদের সংস্থান করতে যারা সক্ষম, তাদের সকলকে গোলামে পরিণত করা উচিত।’ এই ঘোষণার ফলে সুখী সমৃদ্ধশীল লাখ লাখ কৃষককে ভূমি থেকে উত্খাত করে কৃষি খামারগুলোকে করা হলো মেষ চারণভূমি। মেষের পশমের বৃহত্তম যান্ত্রিক কারখানাগুলোতে নামমাত্র মজুরিতে এই সব কৃষককে গোলামে পরিণত করা হয়। এর পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে যে আরও কত ভয়াবহ রোমাঞ্চকর গণনির্যাতন চলছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে তারিখের পূর্বে আমেরিকাসহ আজকের সব উন্নত দেশে শ্রমিকদের দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজে খাটাতো, কারখানার মালিকরা ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে ছয় পেন্স নির্ধারিত মূল্যে স্বামী তাকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এ সব আজকের উন্নত দেশগুলোর শাসকদের প্রজা-শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৃতীয় বিশ্বের আজকের বহু গরিব দেশের চেয়ে ছিল ভয়াবহ। সেই সব দেশ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে গরিব। আর জনগণ ছিল অশিক্ষিত ও অসচেতন। তাই ক্ষমতাধরেরা করেছে নির্যাতন। তাহলে মনীষীদের কথার সত্যতা এ সব নজির থেকে সম্যক উপলব্ধি করা সহজ। দারিদ্র্যের সাথে অশিক্ষা মানুষকে করে অবোধ অসচেতন।
আমরা দেখতে পাই, ধনীরা যেমন দুর্নীতি করে তেমনি ধনী দেশগুলো দুর্নীতি কম করে না। আমেরিকার দুর্নীতি সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন তার আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি গ্রন্থে বলেছেন, ‘জনৈক মার্কিন বিচারক আমার মামলার রায়ের পর যখন জানতে পারেন আমি ‘ডেমোক্র্যাট’ দলের একজন রাজনীতিক তথা ক্লিনটনের স্ত্রী তখন তিনি জানান আমি যদি তা আগে জানতাম তাহলে মামলার রায় অবশ্যই তোমার বিপক্ষে দিতাম।’ হিলারি তার গ্রন্থে আরও বলেছেন, ‘সেখানে সাদা-কালো দ্বন্দ্ব এখনো বিরাজমান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু বেসরকারি অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে কালোদের প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ।’
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই জনসচেতনতা সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে জনকল্যাণে কাজ করার তাগিদে যুগিয়েছে আগ্রহ এবং করেছে আরও সচেতন। তাই প্রত্যেক সরকার জনকল্যাণে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করে নিজ নিজ দেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেখানে কেউ যাতে দুর্নীতি করতে না পারে রাষ্ট্র সেই ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সরকার শাসক-প্রশাসক-আমলা-আমজনতা কারো দুর্নীতি রোধ করার সেই রকম ব্যবস্থা ও নজরদারি করতে অক্ষম। অতএব আমাদের মতো দেশ যে কেবল অভাবে স্বভাব নষ্ট— এই বাণীর আওতায় পড়ে না। কেননা এখানে দুর্নীতি গরিবরা করে না, এখানে দুর্নীতি করে ধনবান, পদবিধারী ও ক্ষমতাধর লোকেরা। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধররা অতীতের বিভিন্ন সময়ে এবং আজকাল যে দুর্নীতি করছেন তা টিআইবির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপরও দুর্নীতি কমেনি, বরং দিন দিন এর মাত্রা আরও বেড়ে চলছে। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথ নয়। এ ব্যাপারে ‘দুদক’ এর বিদায়ী চেয়ারম্যান স্বয়ং বলেছেন, ‘দুদক নখ দন্তহীন বাঘ’। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো দন্তওয়ালা বাঘ। অতএব দন্তহীন বাঘ দন্তওয়ালা বাঘকে কাবু বা শায়েস্তা করতে পারে না। তাই কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দুর্নীতির উত্স অনুসন্ধান করা দরকার। বার্ট্রান্ড বাসেল তার ‘পাওয়ার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের বহু রকমের ক্ষমতা রয়েছে— পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, কথা বলার ক্ষমতা বা বাক্যবল, নৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদি।’ বস্তুত অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার উত্স বলা যায়। আর এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অন্য সব ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে যাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে তারাই দুর্নীতির একচ্ছত্র অধিকারী। কেননা দুর্নীতি করার জন্য আরও যত রকমের ক্ষমতা (পদবির ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাক্যবল ও বাহুল বলের ক্ষমতা) রয়েছে সবই অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট। পদবির অধিকারী হতে হলে যোগ্যতার প্রয়োজন। এই যোগ্যতা আবার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষা জীবনে অনেক অর্থ ব্যয় করে ডিগ্রি হাসিল করে এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় তেমনিভাবে একজন কর্মকর্তা বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান, সাংসদ তার পদবি অর্জনের জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তারপর পদবির ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে দুর্নীতি করেন, ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। প্রবাদ আছে— ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে। কিন্তু এখানে দুর্নীতি করে যারা কলুষিত হয়েছেন তারা সমাজ-রাষ্ট্রে মর্যাদাবান, ঘৃণিত বা নিন্দিত নন। অতএব পদবির ক্ষমতার বদৌলতে বিনিয়োজিত অর্থ তারা সংগ্রহের তাগিদে দুর্নীতি করেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে রাষ্ট্র পদবিধারী ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির নজরদারি করে না, কেবল নজরদারি করে ক্ষমতাহীনদের কার্যকলাপ। সুতরাং দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান উত্স হচ্ছে অর্থনৈতিক ও পদবির ক্ষমতা। আমাদের দেশে দুর্নীতির দ্বিতীয় উত্স হলো পারস্পরিক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা। বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে অন্যের মতো অর্থবিত্ত গাড়ি-বাড়ি, ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মানসে দুর্নীতি করে ক্ষমতাধরেরা, ধনীরা এবং পদবিধারীরা।
দুর্নীতির তৃতীয় উত্স হচ্ছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দাতাগোষ্ঠীর শর্তহীন ও শর্তসাপেক্ষ সাহায্য। এই সাহায্যের সবটুকুই জনগণের ভাগে পড়ে না, এর মোটা অংশের দাবিদার এদেশের ক্ষমতাধর পদবিধারীরা। ক্ষমতার সুবাদে গরিব আমজনতার জন্য বরাদ্দ খয়রাতি সাহায্যের অর্থও রাজনীতিক (মন্ত্রী-এমপি) আমলার মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়ে থাকে। এরকম সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সময় থেকে এদেশে বিদেশি সাহায্য আসা শুরু হয় এবং তখন থেকেই ওই সাহায্যের মোটা অঙ্ক মন্ত্রী-এমপিদের পকেটস্থ হয়। আর তাদের ভিটায় টিনের ঘরের স্থলে দালান নির্মিত হয়।
জনসম্পদ আত্মসাত্: ঘুষ, উেকাচ, বখশিশ ইত্যাদি গ্রহণের সুযোগ ও ক্ষমতা যাদের আছে তারা প্রতিনিয়ত এসব কাজে রত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সাত হাজার টাকা মাহিনা পান,তারা দশ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের বিত্তবৈভব দেখলে সহজেই ধরা পড়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসঙ্গতি। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। তাই ঘুষ-বখশিশ উেকাচ গ্রহণের সুযোগ এবং অবারিত ক্ষমতা যেখানে আছে সেই সব পদবিধারী কর্মচারী-কর্মকর্তারা পদবি ও ক্ষমতার বলে দুর্নীতি করে থাকেন। জনপ্রতিনিধিরা নির্বচানে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজ নিজ সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিয়োগকালে কর্তৃপক্ষের বরাবরে তাদের নিজ নিজ সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় মূল ও অর্জিত সম্পদের উেসর হদিস খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর সম্পত্তির হিসাব দাখিল না করায় রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী-সাংসদ-চেয়ারম্যান-মেম্বার বছরে কত টাকা উপার্জন করেন এবং এই আয় তার কোন কোন উত্স থেকে আসছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অতএব অবৈধভাবে অর্জিত অর্থবিত্ত কালক্রমে তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হয়।
গ্রামের বিচার-সালিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার রায় বা ডিক্রি গরিব মানুষের ললাট-লিখনে নেই, টাকা যার তালগাছটা তারই থাকে। আমাদের দেশে দেওয়ানি আদালতে সংশ্লিষ্ট মক্কেলদের প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং ফৌজদারি আদালতে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এমতাবস্থায় গরিব মক্কেল তার দায়েরি মামলাটি অর্থাভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হওয়ায় আখেরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী অর্থাত্ বছরের পর বছর মক্কেল তার মামলার ব্যয় বহন করতে পারেন না। এই সুবাদে ধনীরা হাতিয়ে নেয় গরিবের সর্বস্ব। ধনীর দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি দিন দিন বাড়ছে। জনগণের সচেতনতার অভাবেও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কোনো দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিভাগীয় তদন্তও পুনরায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়। যেমন— পুলিশ বিভাগের কেউ দুর্নীতি বা অপকর্ম করলে তার তদন্ত করবে পুলিশ বিভাগের লোক। আবার বিমানের বা প্রশাসনের কেউ দুর্নীতি করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করার বিধান রয়েছে। অতএব জ্ঞাতি ভাই তদন্ত প্রতিবেদন তার ভাইয়ের পক্ষেই দেয়, দিয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগী ক্ষমতাহীন লোক বিচার পায় না, আসামি বেকসুর খালাস পায়। এসব কারণে বিশেষত দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে শাস্তি না পেয়ে পার পাওয়ায় পুনরায় দুর্নীতি করার সাহস ও সুযোগ পায় এবং দুর্নীতি কালক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাধরদের তদন্ত বা বিভাগীয় তদন্ত কীভাবে হয়, তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। ‘বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ঝালকাঠির এসপি, র্যাবের মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা হালিম তালুকদার ও লিমনের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী এসআই আরিফুল হকের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে এ সময় রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেনকে রুমের বাইরে অবস্থান করতে দেখা গেছে।’ (যুগান্তর ২৬-০৮-২০১২)।
প্রতিদিন প্রশাসনের প্রিয়রা এমন সব অপরাধ করছেন, যার প্রতিটি শাস্তি অন্তত পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সাংসদদের হাতে চড়-থাপ্পর খাচ্ছেন, এমন কর্মকর্তা ও সাধারণ ভোটার বহু। (প্রথম আলো ২৮-০৮-২০১২)।
এদেশের সাধারণেরা চড় খেলেও তার বিচার হবে না কিন্তু অসাধারণ কাউকে আমজনতার কেউ চড়-থাপ্পর দিলে তার শাস্তি তত্ক্ষণাত্ পেতে হয়। এক্ষেত্রে দু’জন সমান অপরাধী হলেও অসাধারণ শাস্তির দায় থেকে বেকসুর খালাস পান তার ক্ষমতা ও পদবির দাপটের সুবাদে। ক্ষমতার বলে যারা পার পেয়ে যেতে পারে বা পার পেয়ে যায় তারাই বারবার দুর্নীতি করে থাকে।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এক ইঞ্জিনিয়ার বহুদিন পর তার এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার নির্মিত সুন্দর দালান দেখে তিনি এরকম একটি দালান তৈরির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তার বন্ধুর সমীপে। বন্ধুটি শোধান, ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করে এরকম সুন্দর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে এ ভবন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বললেন, কীভাবে ঠিকাদারি করলে এরকম একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যাবে, তার উপায় আমাকে বলে দেন। অপর বন্ধু বলেন, আমি একটি ব্রিজের ঠিকাদারির কাজ পেয়ে এ ভবনটি বানিয়েছি। বন্ধুটি তখন ব্রিজ দেখানোর জন্য এক নদীতীরে তার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যান। ইঞ্জিনিয়ার বলেন, নদীর ওপর কোনো ব্রিজ তো দেখছি না। ঠিকাদার বন্ধু জানান, ব্রিজটির কাজ না করে ওই টাকা দিয়েই অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি নির্মাণ করেছি যা কেবল তোমার নজরই কাড়েনি, ভবনটি যে-ই দেখে তারই নজর বাড়ে। আমাদের পিতা-পিতামহের আমলে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে তাকে সবাই ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর আজকাল তারা সমাজ-রাষ্ট্রে প্রশংসিত এবং ক্ষমতাধর। তাই বাড়ছে দুর্নীতি।
দুর্নীতি প্রতিরোধে মহাজোট সরকার ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ আইন প্রণয়ন করেছেন। এই আইনের মর্মকথা হলো দুর্নীতির সংবাদ যিনি প্রকাশ বা প্রচার করবেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কেউ দায়ের করত পারবে না। তবে তিনি যদি তথ্যনির্ভর ও সঠিক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করে প্রমাণহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। লেখকদের লেখালেখির স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাজোট সরকার আরও একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো— কোনো লেখকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ পেশ করলে আদালত আগের মতো অভিযোগ গ্রহণের সাথে সাথে তত্ক্ষণাত্ কোনো ওয়ারেন্ট অভিযুক্ত লেখকের নামে ইস্যু করবে না। অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে প্রমাণের পর বিচারে শাস্তি কিংবা বেকসুর খালাস পাবেন অভিযুক্ত লেখক। এ দুটো আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দুর্নীতি প্রকাশ ও প্রচারে লেখক-সাংবাদিকরা আগের মতো পুলিশি হয়রানি বা ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন না। বিচারের রায়ে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নতুবা অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি। তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা বা তথ্য প্রকাশে আগের মতো সরকারি বাধা না থাকায় লেখক-সাংবাদিক সমাজ-রাষ্ট্রের দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের দুর্নীতি-অপকর্ম জনসমক্ষে প্রকাশে ও প্রচারে উত্সাহিত হবেন। তবে এই প্রকাশিত তথ্য দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়।
আমাদের দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে-কলমে যতটুকু স্বাধীন বাস্তবে ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে না। এ সব প্রতিষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের খবরদারির কারণে ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নামের দ্বারাই বোঝা যায় যে, এটা দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত একটি স্বাধীন সংস্থা। কিন্তু ‘দমন’ শব্দটি দুর্নীতি নির্মূলের ইঙ্গিত দেয় না, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা বোঝায় না; বোঝায় দুর্নীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সেই জন্য তা দমন করা। দমিত কোনো অপকর্ম যথাযথ নজরদারির অভাবে যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল বা প্রতিরোধ করা গেলে এটা রাতারাতি আর শিকড় গজাতে পারবে না। অধিকন্তু, দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ।’ দুর্নীতি দমনে দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা দুদকের চেয়ারম্যানের উক্তি থেকেই জানা গেছে। এছাড়া দুদকের ক্ষমতা যে সীমিত তা বাস্তবে প্রমাণিত সত্য। কেননা দুদক রাঘববোয়ালদের দুর্নীতি ও অপকর্মের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এখন একমাত্র জনসচেতনতা ও নৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হওয়া ছাড়া এদের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। তবে দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক ও নিরপেক্ষ হলে এবং দুদককে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তার ক্ষমতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হলে ‘দুদক’ অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের জনগণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এই দুই দলে বিভক্ত। তারা নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির কথা ভাবে না, ভাবে তাদের নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মতো। আমাদের শিক্ষা পারেনি জনগণকে সচেতন করতে, উন্নত দেশের জনগণের মতো। সর্বোপরি কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা সেই বোধ সৃষ্টি করেনি। সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাই মিথ্যা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হয়নি। যেদিন উন্নত দেশগুলোর মানুষের মতো এদেশের মানুষ সচেতন হবে সেদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসে এদেশের প্রতিটি সরকার জনকল্যাণে কাজ করবে, করবে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন। তখন এদেশে আর কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ ও সাহস পাবে না এবং দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত। অধিকন্তু, দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য জনগণকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে একই দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেহায়েত জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট - See more at: http://www.dailybartoman.com/details.php?id=6509#sthash.So4bXXTy.dpuf
No comments:
Post a Comment