সুনীতি নির্বাসনে; দুর্নীতি সিংহাসনে
প্র ফে স র ড. সু কো ম ল ব ড়ু য়া
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
একুশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উন্নতির এমন এক শীর্ষস্থানে এসেও
বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে
দাঁড়াতে পারছে না। অফুরন্ত সম্পদ আর বিপুল জনশক্তি থাকার পরও জাতীয় উন্নয়ন ও
অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তার মধ্যে
দুর্নীতি হলো অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি দুর্নীতি কীভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। এ দুর্নীতির কারণে দেশে বিরাজ করছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক এক চরম অস্থিতিশীলতা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, অর্থনৈতিক চরম দুরবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক জীবনে নানা ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অহরহ। তাই আজ আমাদের এই প্রিয় দেশটির এত করুণ দশা। এত চেষ্টার পরও আজ আমরা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। পারছি না কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতেও। চারদিকে যেন চলছে চরম এক অরাজকতা।
কেন জানি এই একটি সুন্দর দেশের প্রতি আমাদের এত অবহেলা? কী নেই আমাদের দেশে? প্রাকৃতিক আর নৈসর্গিক সম্পদভরা এদেশে নদী, সাগর, খাল-বিল, পর্বত, বিশাল সবুজ মাঠ তো আছেই; আছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল জনসম্পদও। তারপরও কেন আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নতির দিকে এগুতে পারছি না? মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না? নিজকে প্রশ্ন করি বার বার। এর উত্তর মেলে শুধু, নীতি-নৈতিকতার অভাব; আর যেন আত্মশক্তি অপব্যবহারের ব্যর্থতা। একে আরও সহজভাষায় বললে বলা যায়, এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের সমাজের নানা স্তরে অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, উেকাচ তো আছেই; এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের দেশপ্রেমের অভাববোধটুকুও। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক সঙ্কট আর অস্থিতিশীলতার বিরাট বাধাও।
দুর্নীতি বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে যেখানে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সামগ্রিক জনজীবনে। আমরা জানি, যে কোনো দেশ, সমাজ, বিশ্ব; এমনকি পরিবারও যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সেখানে কেউ আর সুস্থ ও সবলভাবে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অবস্থাও আজ তাই। সেজন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতিবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘দুর্নীতি এক মারাত্মক ব্যাধি যার আক্রমণে গোটা সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়।’
‘দুর্নীতি’ বলতে আমরা আক্ষরিক অর্থে সমাজে প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধাচরণকেই বুঝি। সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, উেকাচ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত্, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়, সম্পদের অপচয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন কিংবা নানা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপহার গ্রহণ করা প্রভৃতিই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির সঠিক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন, যেখানে ব্যক্তি তার নানা অপরাধ সংঘটিত করে অতি সংগোপনে নানাভাবে, নানা অজুহাতে, পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে। তাই বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ বলেন, ‘ওহ পড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ ধ ঢ়বত্ংড়হ রিষষভঁষষু হবমষবপঃবফ যরং ংঢ়বপরভরবফ ফঁঃু রহ ড়ত্ফবত্ ঃড় যধাব ধ ঁহফবত্ ধফাধহঃধমব.’ অর্থাত্ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার। এই অর্থে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করাকেই দুর্নীতি বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে আরও নানা সংজ্ঞা আছে। তবে সব মতের যে সিদ্ধান্ত সেটি হলো ‘ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ সবধহং ধহুঃযরহম ফড়রহম রহ ঁহঁংঁধষ ধুি.’
আমরা জানি দুর্নীতি কোনো জীবজন্তু কিংবা পশুপাখি করে না; দুর্নীতি করে মানুষ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ জীবটি। তাই শাস্ত্র বলছে, ‘যে জীবন অর্থলোলুপ, তীব্র অর্থলালসায় বিভোর সেই জীবনই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয় অধিক। তিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-জ্ঞানী, সরকারি-বেসরকারি, বিত্তশালী, ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন। আমরা বুঝি, যে জীবন অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে ধাবিত সেই জীবন দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয় বেশি। সে জীবন মানবতাকে করে ভূলুণ্ঠিত, কলুষিত। আর জাতীয় জীবনে ডেকে আনে চরম সর্বনাশা পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে প্লেটোর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে নিরর্থক।’ আমাদের দেশের আজ তাই হয়েছে।
আজ আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারলেও এর থেকে উত্তরণের পথগুলো খুঁজতে পারছি না আমরা। নেই কোনো বিচারের ব্যবস্থা, নেই কোনো শাস্তির ভয়-ভীতি এবং দণ্ডও। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশের উঁচুস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে, যেখানে সহজে হাত দেয়া যায় না। দেশের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমাসহ সমাজ ও দেশের নানা সেক্টরের ক্ষমতাধররা যেখানে সংঘবদ্ধভাবে এই কাজগুলো করছে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কী করবে? বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির জন্য আইনশৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। নানা অপরাধচক্র কিংবা রাষ্ট্রের শক্তিধর ব্যক্তিরা দুর্নীতির নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে। আজকে দেশের অবস্থা মারাত্মক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। সুনীতি যেন আজ নির্বাসনে চলে গেছে, দুর্নীতি যেন আজ রাজার ঘরে সিংহাসনে বসে আছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।
আমরা যদি সবাই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হই, ধর্মের অনুশাসন ও নীতি-নৈতিকতাগুলো মেনে চলি, আজ আমাদের জন্য এত দুরবস্থা হয় না। আমরা কেউ সিচন্তা করি না। সত্কর্ম করি না। কাজের ভালো-মন্দ বিচার করি না। এই জন্যই তো বৌদ্ধ নীতি-দর্শনে আটটি সুন্দর নীতির কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় বৌদ্ধ পারিভাষিক অর্থে আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি পদ অনুসরণ করে চললে সেই মানবজীবন হবে ধন্য, গৌরবান্বিত। সেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ তথা দেশ হবে অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। এজন্যই সব ধর্মে সুনীতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আদর্শ ও সচ্চরিত্র গঠনের কথা।
সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ-কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ লোপাট, ডেসটিনির অবৈধ টাকা আত্মসাত্ ও পাচার, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে কিনা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে এসব দুর্নীতি সব খবরকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় এ খবর কে না জানে? আমরা যেমন অবাক হয়েছি, আমাদের মতো বিশ্বও অবাক হয়েছে। তারা ভাবছে, ছোট্ট একটা দেশে এ কী হচ্ছে?
বৌদ্ধ মতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ মঙ্গল হলো ব্যক্তির চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিচিত্ত উদার ও নির্মলীকরণ এবং মন্দ বা অকুশলবর্জিত জীবনধারণ করা। এটিই সুস্থ ও সফল জীবনধারণ করার মূল উপাদান। এই জীবনপদ্ধতি প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত সবাই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলে, অনুশীলন করলে সমাজের নানা স্তরে, রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে এবং গোটা বিশ্বের মানব জীবনে অবশ্যই সন্ত্রাস নির্মূল হবে, সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে।
অতএব আমাদের দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই ব্যক্তিকে সত্ হতে হবে। নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নিজেকে শাসন করতে হবে। বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দেশপ্রেম ও দেশের মর্যাদার জন্য নিরঙ্কুশ চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি সব অপরাধকে একটি বন্ধনীর মধ্যে আনতে হবে যেন মানবিক গুণগুলোকে জাগাতে পারি এবং পাশাপাশি আমাদের মানবিক গুণগুলোকে ব্যবহার করতে হবে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে, সর্বজায়গায়। এজন্যই আমাদের সবাইকে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এক কাতারে, সংঘবদ্ধভাবে।
প্রার্থনা করি আমাদের দেশের সব ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন, অপরাধ ও অনৈতিকতা দূরীভূত হোক। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসুক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি দুর্নীতি কীভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত। এ দুর্নীতির কারণে দেশে বিরাজ করছে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক এক চরম অস্থিতিশীলতা। শুধু তাই নয়, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পশ্চাত্পদতা, অর্থনৈতিক চরম দুরবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক জীবনে নানা ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অহরহ। তাই আজ আমাদের এই প্রিয় দেশটির এত করুণ দশা। এত চেষ্টার পরও আজ আমরা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। পারছি না কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতেও। চারদিকে যেন চলছে চরম এক অরাজকতা।
কেন জানি এই একটি সুন্দর দেশের প্রতি আমাদের এত অবহেলা? কী নেই আমাদের দেশে? প্রাকৃতিক আর নৈসর্গিক সম্পদভরা এদেশে নদী, সাগর, খাল-বিল, পর্বত, বিশাল সবুজ মাঠ তো আছেই; আছে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল জনসম্পদও। তারপরও কেন আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নতির দিকে এগুতে পারছি না? মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না? নিজকে প্রশ্ন করি বার বার। এর উত্তর মেলে শুধু, নীতি-নৈতিকতার অভাব; আর যেন আত্মশক্তি অপব্যবহারের ব্যর্থতা। একে আরও সহজভাষায় বললে বলা যায়, এর একমাত্র কারণ হলো আমাদের সমাজের নানা স্তরে অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ঘুষ, উেকাচ তো আছেই; এর সঙ্গে যুক্ত আছে আমাদের দেশপ্রেমের অভাববোধটুকুও। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক সঙ্কট আর অস্থিতিশীলতার বিরাট বাধাও।
দুর্নীতি বর্তমান বাংলাদেশে এমন এক মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে যেখানে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সামগ্রিক জনজীবনে। আমরা জানি, যে কোনো দেশ, সমাজ, বিশ্ব; এমনকি পরিবারও যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সেখানে কেউ আর সুস্থ ও সবলভাবে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অবস্থাও আজ তাই। সেজন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতিবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘দুর্নীতি এক মারাত্মক ব্যাধি যার আক্রমণে গোটা সমাজ ও দেশ ধ্বংস হয়।’
‘দুর্নীতি’ বলতে আমরা আক্ষরিক অর্থে সমাজে প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধাচরণকেই বুঝি। সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহার, উেকাচ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত্, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়, সম্পদের অপচয়, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন কিংবা নানা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপহার গ্রহণ করা প্রভৃতিই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির সঠিক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন, যেখানে ব্যক্তি তার নানা অপরাধ সংঘটিত করে অতি সংগোপনে নানাভাবে, নানা অজুহাতে, পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে। তাই বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ বলেন, ‘ওহ পড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ ধ ঢ়বত্ংড়হ রিষষভঁষষু হবমষবপঃবফ যরং ংঢ়বপরভরবফ ফঁঃু রহ ড়ত্ফবত্ ঃড় যধাব ধ ঁহফবত্ ধফাধহঃধমব.’ অর্থাত্ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষমতা বা প্রভাবের অবৈধ স্বার্থপ্রণোদিত ব্যবহার। এই অর্থে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ পরিপন্থী কোনো কাজ করাকেই দুর্নীতি বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে আরও নানা সংজ্ঞা আছে। তবে সব মতের যে সিদ্ধান্ত সেটি হলো ‘ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃরড়হ সবধহং ধহুঃযরহম ফড়রহম রহ ঁহঁংঁধষ ধুি.’
আমরা জানি দুর্নীতি কোনো জীবজন্তু কিংবা পশুপাখি করে না; দুর্নীতি করে মানুষ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ জীবটি। তাই শাস্ত্র বলছে, ‘যে জীবন অর্থলোলুপ, তীব্র অর্থলালসায় বিভোর সেই জীবনই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হয় অধিক। তিনি শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-জ্ঞানী, সরকারি-বেসরকারি, বিত্তশালী, ক্ষমতাবান যেই হোক না কেন। আমরা বুঝি, যে জীবন অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে ধাবিত সেই জীবন দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয় বেশি। সে জীবন মানবতাকে করে ভূলুণ্ঠিত, কলুষিত। আর জাতীয় জীবনে ডেকে আনে চরম সর্বনাশা পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে প্লেটোর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শাসক যদি ন্যায়বান হয় তাহলে আইন অনাবশ্যক, আর শাসক যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলে নিরর্থক।’ আমাদের দেশের আজ তাই হয়েছে।
আজ আমাদের দেশের দুর্নীতির কারণগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারলেও এর থেকে উত্তরণের পথগুলো খুঁজতে পারছি না আমরা। নেই কোনো বিচারের ব্যবস্থা, নেই কোনো শাস্তির ভয়-ভীতি এবং দণ্ডও। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশের উঁচুস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে, যেখানে সহজে হাত দেয়া যায় না। দেশের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক-বীমাসহ সমাজ ও দেশের নানা সেক্টরের ক্ষমতাধররা যেখানে সংঘবদ্ধভাবে এই কাজগুলো করছে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কী করবে? বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির জন্য আইনশৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। নানা অপরাধচক্র কিংবা রাষ্ট্রের শক্তিধর ব্যক্তিরা দুর্নীতির নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে। আজকে দেশের অবস্থা মারাত্মক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এর থেকে বাদ যাচ্ছে না। সুনীতি যেন আজ নির্বাসনে চলে গেছে, দুর্নীতি যেন আজ রাজার ঘরে সিংহাসনে বসে আছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।
আমরা যদি সবাই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হই, ধর্মের অনুশাসন ও নীতি-নৈতিকতাগুলো মেনে চলি, আজ আমাদের জন্য এত দুরবস্থা হয় না। আমরা কেউ সিচন্তা করি না। সত্কর্ম করি না। কাজের ভালো-মন্দ বিচার করি না। এই জন্যই তো বৌদ্ধ নীতি-দর্শনে আটটি সুন্দর নীতির কথা বলা হয়েছে, যাকে বলা হয় বৌদ্ধ পারিভাষিক অর্থে আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি পদ অনুসরণ করে চললে সেই মানবজীবন হবে ধন্য, গৌরবান্বিত। সেই ব্যক্তি কিংবা সমাজ তথা দেশ হবে অনেক উন্নত, অনেক সমৃদ্ধ। এজন্যই সব ধর্মে সুনীতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আদর্শ ও সচ্চরিত্র গঠনের কথা।
সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ-কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের অর্থ লোপাট, ডেসটিনির অবৈধ টাকা আত্মসাত্ ও পাচার, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে কিনা তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘটে যাচ্ছে এসব দুর্নীতি সব খবরকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় এ খবর কে না জানে? আমরা যেমন অবাক হয়েছি, আমাদের মতো বিশ্বও অবাক হয়েছে। তারা ভাবছে, ছোট্ট একটা দেশে এ কী হচ্ছে?
বৌদ্ধ মতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ মঙ্গল হলো ব্যক্তির চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিচিত্ত উদার ও নির্মলীকরণ এবং মন্দ বা অকুশলবর্জিত জীবনধারণ করা। এটিই সুস্থ ও সফল জীবনধারণ করার মূল উপাদান। এই জীবনপদ্ধতি প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত সবাই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলে, অনুশীলন করলে সমাজের নানা স্তরে, রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে এবং গোটা বিশ্বের মানব জীবনে অবশ্যই সন্ত্রাস নির্মূল হবে, সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে।
অতএব আমাদের দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই ব্যক্তিকে সত্ হতে হবে। নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। নিজেকে শাসন করতে হবে। বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি দেশপ্রেম ও দেশের মর্যাদার জন্য নিরঙ্কুশ চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি সব অপরাধকে একটি বন্ধনীর মধ্যে আনতে হবে যেন মানবিক গুণগুলোকে জাগাতে পারি এবং পাশাপাশি আমাদের মানবিক গুণগুলোকে ব্যবহার করতে হবে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে, সর্বজায়গায়। এজন্যই আমাদের সবাইকে, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এক কাতারে, সংঘবদ্ধভাবে।
প্রার্থনা করি আমাদের দেশের সব ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দুঃশাসন, অপরাধ ও অনৈতিকতা দূরীভূত হোক। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আসুক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।

